সেদিনের কথা আজও ভুলিনি

শিক্ষাবিদ ও শিশুসাহিত্যিক অধ্যাপক হালিমা খাতুন ছিলেন গত শতাব্দীর পাঁচের দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ভাষা আন্দোলনের একজন সংগঠক হিসেবে সে সময়ে স্কুল ও কলেজের ছাত্রীদের সংগঠিত করার দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যে কয়জন পাকিস্তানি শাসকের ঘোষিত ১৪৪ ধারা প্রথমে অমান্য করেছিলেন তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। সে সময় নারী শিক্ষার্থীদের চলাফেরার ক্ষেত্রে বেশ কড়াকড়ি থাকলেও অতিগোপনে মনিসিংহ ও অন্য কমরেড গুরুদের ক্লাস ও সভায় যোগদান করতেন।

কেমন কড়াকড়ি তা বর্ণনা করেছেন তার ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো’ নিবন্ধে। তারা তখন থাকতেন এখনকার রোকেয়া হলে। তখনো রোকেয়া হল নামকরণ হয়নি। নাম ছিল Women Students Residence (WRS)। তাদের সময়ে মোট ছাত্রী ছিলেন ৩০ জন। লোকাল গার্ডিয়ানের লিখিত অনুমতিপত্র ছাড়া কেউ তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারত না। নিউ মার্কেট বা নবাবপুরে যেতে হলে চার-পাঁচজন মিলে সুপারের কাছে গিয়ে অনুমতি নিতে হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ মাইলের মধ্যে কোনো ছেলে শিক্ষার্থীর সঙ্গে মেয়ে শিক্ষার্থীর কথা বলা ছিল একদম নিষেধ। এর মধ্যেও তখনকার নারী শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য আন্দোলন করেছেন।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে হালিমা খাতুনের দায়িত্ব ছিল বাংলাবাজার গার্লস স্কুল ও মুসলিম গার্লস স্কুলের ছাত্রীদের আমতলার মিটিংয়ে নিয়ে আসার। সকাল থেকেই ১৪৪ ধারা জারি করেছিল সরকার। সভায় শুরু হয়েছিল মতবিরোধ। একদল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে চায়, অন্য দল এর বিরুদ্ধে। নারী শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে স্কুল-কলেজের মেয়েরাই ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে সেদিন স্লোগান তুলেছিলেন। ক্রমে এই দাবি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সিদ্ধান্ত হয়, ছেলেরা ১০ জন করে এবং মেয়েরা ৪ জন করে পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে যাবে। হালিমা খাতুনের নেতৃত্বেই মেয়েদের প্রথম চারজনের দলটি পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে। এরপরের চারজনও একই পদ্ধতিতে পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে। কিন্তু তৃতীয় দল ও চতুর্থ দলকে পুলিশ আটক করে গাড়িতে তুলে ফেলে। এরপর ছাত্ররা দলে দলে তীব্র স্রোতের মতো পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে মিছিল করতে করতে বেরিয়ে আসে। শুরু হয় টিয়ার গ্যাস শেলিং। চোখে তীব্র জ্বালাপোড়া আর পানি নিয়ে সেদিন তারা স্লোগান দিয়েছিলেন ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। টিয়ার গ্যাস দিয়ে রুখতে না পেরে পুলিশ শুরু করে লাঠিচার্জ। তাতেও রুখতে না পেরে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। তারা তখন সেøাগান দিতে দিতে মেডিকেল কলেজে ঢুকে পড়েন। সেখান থেকেই বিহ্বল হয়ে দেখছিলেন স্ট্রেচারে করে নিয়ে আসা হচ্ছে আহতদের, মুহুর্মুহু চলছে গুলি, আতর্নাদ, স্লোগান।

গুলি থামলে গিয়েছিলেন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি বাঁশ নির্মিত ছাত্রাবাসের কাছে, যেখানে গুলি চলেছিল, যেখানে এখন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার রয়েছে। রক্তে ভেসে গিয়েছিল সেদিন শহীদ মিনারের ওই জায়গাটি। সেদিনের স্মৃতি উল্লেখ করে হালিমা খাতুন লিখেছেন, ‘এখানে গিয়ে দেখি বিশাল জায়গা জুড়ে রক্ত। অত রক্ত একসঙ্গে কখনো দেখিনি। ...ওই রক্ত পতাকার পাশেই বাঁশের খুঁটিতে ঝুলানো ছিল শহীদদের রক্তে ভেজা পাজামা ও শার্ট। তখনো তা থেকে রক্তের ধারা ঝরছে। তা থেকে একটু দূরে একজনের মাথার খুলি উড়ে গেছে ও মগজ ছড়িয়ে রয়েছে অনেকখানি জায়গা জুড়ে। ... সেদিনের কথা আজও ভুলিনি।’