ক্লাব বিশ্বকাপ: ইনফান্তিনোর গর্ব নাকি ফুটবলের ভার!

প্যারিস সেইন্ট জার্মেই ও চেলসির মধ্যকার আজকের ফাইনালের মধ্য দিয়ে পর্দা নামছে সবচেয়ে বিতর্কিত এক ফুটবল আয়োজনের—নতুন ফরম্যাটের ক্লাব বিশ্বকাপ। শুরু থেকেই যেটিকে অনেকে বলেছিলেন ‘ইনফান্তিনোর আত্মপ্রেমের প্রকল্প’, আবার অনেকে একে বলছেন ‘বিশ্বজয়ী ক্লাব ফুটবলের নতুন সূচনা।’

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মতে, ‘এটা ছিল বিশাল সাফল্য—তিনবার বলছি, বিশাল!’ কিন্তু সত্যিই কি তাই?

আগে প্রতি বছর সাত দলের অংশগ্রহণে শীতকালীন সময়ে হতো ক্লাব বিশ্বকাপ। এবার যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপের আদলে এক মাসে ৩২টি দলের অংশগ্রহণে হয়েছে ৬৩টি ম্যাচ। নতুন এই রূপ ফুটবল দুনিয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া জন্ম দিয়েছে।

ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলের সাবেক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ তো এটিকে সরাসরি বলেছেন ‘ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বাজে ধারণা।’ মূলত সূচির জটিলতা, অতিরিক্ত খেলার চাপ, ফাঁকা গ্যালারি আর খেলোয়াড় ক্লান্তি—এসবই ছিল এই আয়োজনের বড় প্রশ্নচিহ্ন।

দর্শকসংখ্যা: কোথাও শুনশান, কোথাও উন্মাদনা

চারটি ম্যাচে দর্শকসংখ্যা ছিল ১০ হাজারের নিচে, এর মধ্যে সর্বনিম্ন ৩,৪১২ জন দেখেছেন মামেলোডি সানডাউনস ও উলসান এইচডির ম্যাচ। অথচ পিএসজি ও রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচগুলোতে গ্যালারি উপচে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দর্শক এসেছেন পাসাডেনায়, যেখানে পিএসজি ৪-০ গোলে হারিয়েছে আতলেতিকো মাদ্রিদকে—সংখ্যা ৮০,৬১৯ জন।

গড় দর্শকসংখ্যা ৩৮,৩৬৯—যা ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপের পর সবচেয়ে কম। তবে ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গারের দাবি, ‘আমরা আগেই ধারণা করেছিলাম দর্শক কম হবে, বাস্তবে তা বেশি ছিল।’

আর্থিক প্রাপ্তি: ক্লাবগুলোর চোখে স্বপ্ন

টুর্নামেন্টজুড়ে থাকা আর্থিক প্রণোদনা ক্লাবগুলোর আগ্রহ বাড়িয়েছে। বিজয়ী দল পাবে প্রায় ৯১ মিলিয়ন পাউন্ড। এমনকি শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেওয়া ম্যানসিটি পেয়েছে ৩৮ মিলিয়ন পাউন্ড। ফাইনালে উঠে চেলসি এরই মধ্যে প্রায় ৮০ মিলিয়ন পাউন্ড ঘরে তুলেছে।

ফিফার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিজয়ী ক্লাব ২০২৯ সালের গ্রীষ্ম পর্যন্ত নিজেদের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরিচয় দিতে পারবে, জার্সিতে থাকবে সেই বিশেষ ‘বেজ’।

মাঠের ফুটবল: গোলের ঝলক, নাটকীয়তা

যদিও শুরুতে একপেশে ম্যাচগুলো হতাশ করেছিল (বায়ার্নের ১০-০ গোলে জয় তার প্রমাণ), কিন্তু এরপরই শুরু নাটকের। ম্যানসিটির সঙ্গে আল হিলালের ৪-৩ গোলের রোমাঞ্চকর লড়াই, বেনফিকার ৯৫ মিনিটে পাওয়া পেনাল্টিতে চেলসিকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়া কিংবা চেলসির বিপক্ষে পালমেইরাসের কাছে এস্তেভাওয়ের গোল—সবই ছিল নাটকীয় ও উপভোগ্য।

বিশ্ব তারকাদের পারফরম্যান্সও নজর কেড়েছে। মেসির ফ্রি-কিক, পিএসজির নয়জন নিয়ে বায়ার্নকে হারানো কিংবা রিয়ালের শেষ মুহূর্তে জয়ে তিন গোল—এসব কিছুই মাঠের ফুটবলকে করেছে জমজমাট।

বিশ্বব্যাপী আগ্রহ: মিশ্র সাড়া

এই নতুন ক্লাব বিশ্বকাপ যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো মর্যাদা পায়নি, তা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। বিবিসির লাইভ কাভারেজ ও প্রতিবেদনগুলো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের তুলনায় ৫০ শতাংশ কম পাঠক পেয়েছে। তবু এই প্রতিযোগিতা অনেক মাঝারি বা ক্ষুদ্র টুর্নামেন্টের চেয়ে অনেক বেশি দর্শক টেনেছে।

চেলসি বনাম এলএ এফসির ম্যাচ যুক্তরাজ্যে দেখেছেন ১.৬ মিলিয়ন মানুষ, রিয়াল বনাম আল হিলাল ম্যাচ ১.১ মিলিয়ন। এমনকি সৌদি আরবে রাত ৪টায় শুরু হওয়া আল হিলালের ম্যাচও দেখেছেন দেড় মিলিয়নের বেশি দর্শক। ব্রাজিলে তো পুরো উৎসব! কোপাকাবানার ফ্যান-ফেস্টে দর্শকসংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে।

ক্লান্তি ও ইনজুরি: সামনে বিপদের শঙ্কা

এই টুর্নামেন্ট শেষ হলেও ঝুঁকি শেষ হয়নি। অধিকাংশ খেলোয়াড়ের মৌসুম শেষ হয়েছে আন্তর্জাতিক ম্যাচ দিয়ে, সেখান থেকে সরাসরি এই বিশ্বকাপে। সামনে মাত্র এক মাস বিরতি নিয়ে আবার নতুন মৌসুম। ক্লান্তি, ইনজুরি ও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ফুটবলে কতটা পড়বে, তা এখনই বলা কঠিন।

বায়ার্নের তরুণ তারকা জামাল মুসিয়ালা তো ইতিমধ্যেই পড়েছেন বড় ইনজুরিতে—পিএসজির গোলরক্ষক দোন্নারুম্মার ট্যাকলেই ভেঙেছে পা, হয়েছে গোড়ালি স্থানচ্যুতি।

আমেরিকান ছোঁয়া

টুর্নামেন্টে ছিল কিছু অভিনব ব্যাপার। ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ নয়, বলা হয়েছে ‘সুপিরিয়র প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’। কিক-অফের আগে একে একে নাম ডাকা, ম্যাচ শুরুর ক্ষণগণনা, হাফটাইমে মিউজিক শো, এমনকি রেফারির শরীরে লাগানো ‘রেফ ক্যাম’ দিয়ে খেলার ফুটেজ—এসবই চমক দিয়েছে।

সংক্ষেপে, ক্লাব বিশ্বকাপের এই নতুন ফরম্যাট একদিকে যেমন দিয়েছে গোল, নাটক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ লড়াই, অন্যদিকে তুলেছে প্রশ্ন—ভবিষ্যতের ফুটবল কি শারীরিকভাবে এই বোঝা বইতে পারবে? আর কি আসলেই দরকার এত ব্যস্ত ক্যালেন্ডারে আরেকটি মেগা টুর্নামেন্ট?

উত্তর সময়ই দেবে। তবে আজকের ফাইনালে হয়তো ইনফান্তিনোর আত্মবিশ্বাস আরও এক ধাপ চড়া হবে। কিন্তু ক্লান্ত খেলোয়াড়দের চোখে সে হাসি কতটা সত্যিকারের, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতেই হবে।