দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণাকে আরও গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য করতে এবার ঐকমত্যে পৌঁছেছে দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দ্বিতীয় পর্যায়ের সংলাপে গতকাল রবিবার দলগুলো একমত হয়েছে যে, জরুরি অবস্থা জারির জন্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে মন্ত্রিসভার লিখিত সম্মতির প্রয়োজন হবে।
সংবিধানের সংশোধনের প্রস্তাব : কমিশন সংবিধানের ১৪১(ক) অনুচ্ছেদের সংশোধনী প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির কাছে সন্তোষজনকভাবে প্রমাণিত হলে তিনি জরুরি অবস্থা জারি করতে পারবেন, তবে তার আগে মন্ত্রিসভার লিখিত অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে। বিদ্যমান সংবিধানে জরুরি অবস্থা জারির সময়সীমা ১২০ দিন বলা থাকলেও, প্রস্তাবনায় সেটি ৯০ দিনে সীমিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও পরামর্শ : অনেক রাজনৈতিক দল প্রস্তাবিত সংশোধনের সঙ্গে একমত হলেও, কিছু দল বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক চান সর্বদলীয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হোক।
খেলাফত মজলিশ ও জামায়াতে ইসলামী চায় মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা বা উপনেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হোক।
ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিরোধীদলীয় নেতার অনুপস্থিতিতে উপনেতা যেন উপস্থিত থাকেন, সেটি সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা উচিত। অবশেষে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, মন্ত্রিসভার অনুমোদন ছাড়া জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা যাবে না এবং বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা বা তার অনুপস্থিতিতে উপনেতার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
মৌলিক অধিকার হরণে বিধিনিষেধ : এ ছাড়া প্রস্তাবে সংবিধানের ৪৭(৩) ধারা অনুযায়ী, জরুরি অবস্থার মধ্যেও কোনো নাগরিকের জীবন, নির্যাতন থেকে মুক্তি, মর্যাদা ও মানবাধিকার খর্ব করা যাবে না বলে সুপারিশ করা হয়।
ড. আলী রীয়াজের মন্তব্য : জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘চলতি সপ্তাহেই আমরা দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রত্যাশা করছি। রাজনৈতিক দলগুলো যদি কিছু ছাড় দিয়ে এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়, তাহলে জাতীয় সনদের কাঠামো আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে নির্ধারণ সম্ভব হবে।’
অন্য বিষয়েও আলোচনা : একই বৈঠকে প্রধান বিচারপতির নিয়োগপ্রক্রিয়া ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়। জামায়াত চায়, আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিই হবেন প্রধান বিচারপতি। তবে কয়েকটি দল প্যানেলভিত্তিক নির্বাচন চায়।
এনডিএম মহাসচিব মোমিনুল আমিন অভিযোগ করেন, ঐকমত্য কমিশনে একটি ‘ঐকমত্য পার্টি’ তৈরি হয়েছে, যারা কমিশনের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও জরুরি অবস্থার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রস্তাব, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে এক বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংলাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে ছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, গণসংহতি, সিপিবি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) সহ ৩০টি রাজনৈতিক দল।