দেশের চলমান আইনশৃঙ্খলার নাজুক পরিস্থিতি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হলেও আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা হবে না বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। তবে সরকারের নানা উদ্যোগের কারণে পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নতির দিকে যাচ্ছে এবং নির্বাচনের সময় সবকিছু শান্ত হবে, অসুবিধা হবে না বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। গতকাল রবিবার বিবিসি বাংলার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সাক্ষাৎকারটির কিছু অংশ নিচে দেশ রূপান্তরের পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হলো
বিবিসি বাংলা : ...সামনে খুব গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন আছে। বড় প্রশ্ন এখন, নির্বাচন কবে হবে সেটা কি এখন আপনি বলতে পারবেন?
সিইসি এএম এম নাসির উদ্দিন : ‘ইটস ভেরি ডিফিকাল্ট ফর মি টু রেসপন্ড, বিকজ আই মাইসেলফ ওন্ট নো এক্স্যাক্ট ডেট (সুনির্দিষ্ট তারিখ)। পোলিং ডেটটা জানি না। এপ্রিলে ফার্স্ট হাফে (প্রথমার্ধে) বলা হচ্ছে। দ্যাট কাইন্ড অব থিং, উইল বি কমিউনিকেট টু আস, উইথ সাম আইডিয়া দ্যাট প্লিজ গো অ্যাহেড, দিস ইজ দ্য রেঞ্জ।
বিবিসি : সরকার আপনাদের জানাবেন যে এই সময়ের মধ্যে ভোট হতে পারে। সেটা কি এখনো জানাননি?
সিইসি : আপনি যেমন জানেন, আমিও তেমনি জানি যে আইদার ফেব্রুয়ারি, মানে রমজান মাসের আগে অথবা এপ্রিলে। যেটা সবসময় উনি (প্রধান উপদেষ্টা) বলে আসছেন। সেটাই জানি, যেটা আপনি জানেন দেশবাসী জানে, ওনার বক্তব্য থেকে। সেটা আমিও জানি।
বিবিসি : সরকার থেকে সংবাদ সম্মেলন করে বলা হয়েছে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তারা প্রস্তুত হতে বলেছেন, সরকার আপনাদের কিছু বলেননি যে কবে নির্বাচন হতে পারে বা কোন সময়ের মধ্যে ভোট হতে পারে?
সিইসি : না, সেরকম বলেনি। আমরা ধরে নিচ্ছি, ইট ইজ আওয়ার অ্যাসাম্পশন (আমাদের ধারণা) যে, বর্তমানে যে টাইম ফ্রেম বলা হচ্ছে, আইদার আর্লি ফেব্রুয়ারি বিফোর রমাদান, অর ইট মে বি সাম টাইম ইন দ্য ফার্স্ট হাফ অব এপ্রিল। হতে পারে, এপ্রিলের প্রথম দিকে হতে পারে। আমরা প্রথম থেকেই ডিসেম্বরকে টার্গেট করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কারণ তখন তিনি ডিসেম্বর টু জুন বলেছিলেন। এজন্য আমরা ডিসেম্বরকে টার্গেট করে, ফ্রম ডে ওয়ান উই স্টার্টেড প্রিপেয়ারিং আওয়ারসেলভ।
বিবিসি: সেটা কবে থেকে? আপনারা যখন শুরু করলেন তখন থেকে?
সিইসি: হ্যাঁ, তখন থেকেই আমরা শুরু করলাম। তারপর থেকে আই ওয়াজ হ্যাভিং মিটিং উইথ মাই অফিশিয়ালস হেয়ার।
বিবিসি : আপনি যখন দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তখন আপনাকে কোনো টাইমফ্রেম বা সময়সীমা নিয়ে কোনো ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে এ সময়ের মধ্যে দেওয়া হতে পারে?
সিইসি : না, দেওয়া হয়নি। বাট আমি ধরে নিয়েছি যে ইলেকশন তো একটা হবে। আমি প্রথমে আমার অফিসারদের সঙ্গে বসেছি যে, একটা ইলেকশন করতে গেলে কী কী দরকার, কী কী কাজ আমাদের করতে হবে, কী কী কাজ বাকি আছে। উনারা আমাদের একটা চার্ট করে দেবেন এবং কোন কাজ করতে কতদিন লাগে সেটা দেবেন। তখন তো আমরা জানি না ডিসেম্বর বা অন্য কোনো টাইমলাইন তো তখনো আসেনি।
বিবিসি : ডিসেম্বর লক্ষ্য করে আপনার প্রস্তুতি কবে থেকে শুরু করলেন?
সিইসি : যখন থেকে প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা করেন; সম্ভবত গত বছর ১৬ ডিসেম্বর উনি যে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। তখন আমি মৌলভীবাজারে ছিলাম। ওখানে বসেই আমি শুনলাম যে ‘আইদার ইট উইল বি ইন ডিসেম্বর, অর ইন জুন’ এটা শুনলাম উনার বক্তব্যের মধ্যে।
বিবিসি : শোনার পর ভাবলেন ডিসেম্বরের মধ্যে হতে পারে?
সিইসি: হ্যাঁ, এইটা শোনার পর প্রস্তুতি বাড়িয়ে দিলাম আমরা, ডিসেম্বরকে ধরে ব্যাক ক্যালকুলেশন করে। কারণ ইলেকশনের ডেট থেকে অন্তত দুই মাস আগে আমাদের শিডিউল ঘোষণা করতে হয় আমাদের আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) অনুসারে। কারণ তফসিল ঘোষণা থেকে ভোটের তারিখ পর্যন্ত যে কর্মকা-গুলো দরকার, তাতে অন অ্যাভারেজ দুই মাস না হলে পারা যায় না। যেমন ধরেন, নমিনেশন ফাইল করার জন্য সময় লাগে।
বিবিসি : তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে দুই মাস কমপক্ষে লাগবে। আপনাদের কথায় মনে হচ্ছে সরকার থেকে আপনারা এই তথ্যগুলো গণমাধ্যম থেকে পাচ্ছেন। কিন্তু সরকার আপনাদের সঙ্গে আলোচনা বা কিছু বলছে কি-না?
সিইসি : আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে সরকারের কাছ থেকে কোনো গাইডেন্সও নেই, পরামর্শও নেই, আদেশও নেই, নির্দেশও নেই, নাথিং। আমরা অ্যাবসোলিউটলি ইন্ডিপেনডেন্টলি এ প্রস্তুতি নিচ্ছি।
বিবিসি : একটা ধারণা দেওয়া যে এই সময়ের মধ্যে হতে পারে, এটা আপনারা আনুষ্ঠানিকভাবে পাননি?
সিইসি: না পাইনি, পাইনি।
বিবিসি : বলা হচ্ছে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হতে পারে। আপনারা কি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত?
সিইসি: সম্পূর্ণ প্রস্তুত। যদি হয় আমাদের তরফ থেকে আমরা প্রস্তুত। আমরা ওভাবে করতে চাই, উনারা যে তারিখে পোলিং ডেট চান, যেদিন ভোট হয়, সেদিন যাতে আমরা একটা ফ্রি ফেয়ার অ্যান্ড ক্রেডিবল ইলেকশন জাতিকে উপহার দিতে পারি, সেই লক্ষ্যেই আমরা প্রস্তুতিটা নিচ্ছি।
বিবিসি: কিছু রাজনৈতিক দল বলছে যে, নির্বাচন করার মতো পরিবেশ এখন নেই, এটার বিষয়ে আপনার কী মত?
সিইসি : অ্যাকচুয়ালি রাজনীতিবিদদের বক্তব্যের বিষয়ে আমরা গাইডেড না। রাজনীতিকরা নানা ধরনের কথাবার্তা বলে। কোনো কোনো দল ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের কথা বলে, পরে আবার ব্যাক ট্র্যাক করে বলছে যে সংস্কারের আগে ভোট হতে পারবে না। নানা ধরনের কথা বলে। এইটা হলো রাজনৈতিক বক্তব্য।
বিবিসি : তারা আইনশৃঙ্খলার নাজুক পরিস্থিতির কথা বলছেন, মব ভায়োলেন্স বা দলবদ্ধ সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, সেটার কথা বলছেন। এর মাঝে নির্বাচন আয়োজন করা কঠিন হবে?
সিইসি : চ্যালেঞ্জিং হবে। বাট ইট ইজ পসিবল। চ্যালেঞ্জিং, কারণ এখন তো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগস্টে যা দেখছিলাম বা গত বছরের ৮ আগস্টে যা দেখছিলাম অনেক ইম্প্রুভ করে গেছে না? অনেক ইম্প্রুভ করছে।
ধরেন নির্বাচন যখন হবে, তখন ওই সময়ের মধ্যে দেখবেন যে সবকিছু শান্ত, অসুবিধা হবে না। বিশেষ করে প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দল ছোট হোক বড় হোক, তারা কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলে আসছে প্রথম থেকেই। কেউ বলেনি যে আমি আগের মতো নির্বাচন চাই। জনগণ যদি আপনার সঙ্গে থাকে, কোনোরকমের কোনো মব বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আপনাকে তো ক্ষতি করতে পারবে না।
বিবিসি : জনগণ তো মব চায় না। কিন্তু সেটা তো নিয়ন্ত্রণে আসেনি এখন পর্যন্ত। দেখা যাচ্ছে তো এটা হচ্ছে নিয়মিত।
সিইসি : আমি কনফিডেন্ট যে ইলেকশন যখন হবে, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ব্রিফিং দিয়েছেন। শুধু পুলিশকে নয়, উনি তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আর্মি থেকে শুরু করে, আর্মি কীভাবে ডেপ্লয়মেন্ট হবে, বিজিবি কীভাবে হবে ইত্যাদি নানাবিধ প্রশ্ন করেছেন। এ চ্যালেঞ্জগুলো সামনে রেখে কিন্তু সরকারের যেমন তার নিজস্ব প্রস্তুতি চলছে, আমাদেরও কিন্তু একইরকম প্রস্তুতি চলছে। এসব চ্যালেঞ্জ কিন্তু আমাদের মাথায়ও আছে। এগুলো অ্যাড্রেস করার জন্য আমরা প্রস্তুত। সব ধরনের ব্যবস্থা আমরা নেব।
বিবিসি : আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আপনারা মনে করছেন না খুব একটা সমস্যা হবে? নির্বাচনের জন্য এটা বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
সিইসি : আমি মনে করি যে নির্বাচনের জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি, একটা ফ্রি ফেয়ার অ্যান্ড ক্রেডিবল ইলেকশন, সেটার জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নট বি প্রবলেম, আমি মনে করি।
বিবিসি : এর মাঝে কোনো কোনো দল আপনাদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে, যেমন এনসিপি। আপনারা কি নিজেদের নিরপেক্ষ বলবেন?
সিইসি: অবশ্যই নিরপেক্ষ। আমাদের ইট ইজ অ্যা কমিটমেন্ট গিভেন টু দ্য নেশন। যেদিন আমি শপথ নিয়েছি, সেদিনই আমি কমিট করেছি, সুপ্রিম কোর্টের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শপথ নিয়েছি। এমনকি আমার অফিসে যারা কাজ করেন, গত ২ মার্চ প্রথম রোজায় ভোটার দিবসে সবাইকে হাত তুলে শপথ করিয়েছি যে, আপনারা সবাই একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষভাবে কাজ করবেন, এমন ওয়াদা আমাকে দেন। পহেলা রমজান অধিকাংশ রোজাদার হাত তুলে শপথ করেছে।
সুতরাং ইসি নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছে, ওই রাজনৈতিক বক্তব্য অ্যাগেইন দিতে পারে। সময়ের বিবর্তনে যখন দেখবে আমরা কাজ করছি নিরপেক্ষভাবে, ধীরে ধীরে যখন আমাদের কাজকর্ম আরও সম্প্রসারিত হবে, তারা রিঅ্যালাইজ করবে যে, না এ নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ আছে। তাদের আস্থা আমাদের ওপর আসবে।
বিবিসি : তাদের একটা অভিযোগ যে আপনারা বিএনপির প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। বিএনপির সঙ্গে আপনার কি সম্পর্ক আছে?
সিইসি : আমি তো বিএনপির সদস্যও না, কোনো নেতাও না। কারও প্রতি আমাদের যে দুর্বলতা আছে, এটা বলতে পারে পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট তো দিতেই পারে। আপনি তো এটা শুনছেন, অনেকে তো আমাকে জামায়াতও বলে। একেকজন একেকটা বলে। এগুলো পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট। আমি এগুলোকে সেভাবে দেখি। উনারা বলতেই পারে।