বিশ্বব্যাপী আলোচনার তুঙ্গে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক। একের পর এক দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে চলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ শুল্কের অতিরিক্ত আরও ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এই পাল্টা শুল্ক কীভাবে কমানো যায়, সে বিষয়ে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর করে। কিন্তু সেখানে কোনো সুরাহা হয়নি বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে।
এ বিষয়ে জানাতে গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলন ডাকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি বাণিজ্য উপদেষ্টা। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাবে শেখ বশিরউদ্দীন ‘নন-ডিসক্লোজেবল ইস্যু’ বলে এড়িয়ে যান। ফলে মার্কিন শুল্ক ইস্যুতে আপাতত কোনো সুখবর নেই বাংলাদেশের।
বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরোপ করা পাল্টা শুল্ক কমানোর বিষয়ে দর-কষাকষি করতে বাণিজ্য উপদেষ্টা, বাণিজ্য সচিবসহ উচ্চপর্যায়ের একটি দল সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর করে। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (ইউএসটিআর) সঙ্গে টানা তিন দিন আলোচনা করেন। দেশে ফিরে গতকাল সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের নেতৃত্বে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে একটি জরুরি বৈঠক করেন পাল্টা শুল্ক চুক্তির খসড়া নিয়ে।
বৈঠক শেষে ট্রাম্পের শুল্ক ইস্যুতে সাংবাদিকরা বিভিন্ন প্রশ্ন করেন বাণিজ্য উপদেষ্টাকে। কেন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি, যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া কী, চুক্তির শর্তে কী কী বিষয় রয়েছে, বাংলাদেশ নেগোশিয়েশনে কোথায় কোথায় ছাড় দিতে পারছে না, নেগোশিয়েশন কতটুকু সফল হলো, বা আমেরিকার চাওয়া পূরণ করতে গিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে সংকট তৈরির শঙ্কা রয়েছে কি না, এসব বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চান। তবে এ ধরনের প্রশ্নের উত্তরে বাণিজ্য উপদেষ্টা কোনো উত্তর দেবেন না বলে জানিয়ে দেন।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেগোশিয়েশনের শর্ত অনুযায়ী এ তথ্যগুলো ‘প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা’ রয়েছে। তবে তিনি বলেন, “আমাদের আলোচনা ‘উৎসাহব্যঞ্জক’ এবং যথেষ্ঠ ‘এনগেজিং’ ছিল।”
এদিকে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময়ে শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে সংকট তৈরি হওয়ার কথা বললেও সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘মার্কিন পাল্টা শুল্ক ইস্যুতে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। আমরাও আশাবাদী।’
সাংবাদিকদের বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘তিন দিন (৯-১১ জুলাই) খুবই ব্যস্ত সময় কাটিয়েছি। দুই দেশের শুল্ক সমঝোতায় প্রায় ৩৫-৪০ জন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সুন্দর সুন্দর কিছু পরামর্শ আমরা পেয়েছি সেখানে। সেগুলো আমরা কাজে লাগাব।’ তিনি বলেন, ‘তিন দিনের দ্বিতীয় দফার বৈঠক শেষে আমরা এখন তৃতীয় রাউন্ডের বৈঠকের জন্য প্রস্তুতি নিতে ফিরে এসেছি। দেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে আজ (গতকাল) বৈঠক করেছি। এ ছাড়া কিছু আন্তঃমন্ত্রণালয়ে আলোচনার বিষয় রয়েছে। সেগুলো শেষ করে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি আবারও আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাব।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রে বৈঠকের সময় সুনির্দিষ্ট কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বা কোন কোন বিষয়ে দুদেশ একমত কিংবা দ্বিমত পোষণ করেছে সাংবাদিকদের এসব প্রশ্নের উত্তরে শেখ বশিরউদ্দীন ‘নন-ডিসক্লোজেবল ইস্যু’ বলে এড়িয়ে যান।
আগামী ১ আগস্ট থেকে পাল্টা শুল্ক পুনঃআরোপিত নাকি নতুন শুল্কহার পাওয়ার যাবে এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, ‘তারা যৌক্তিক শুল্ক নির্ধারণ করবে। কারণ আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছি, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ব্যবসা করছে। ২০১৫ সাল থেকে শুল্ক-কর পরিশোধ করেই সেটা করছে ব্যবসায়ীরা। আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব সক্ষমতার ভিত্তিতে এ ব্যবসা করছে এবং তুলনামূলকভাবে আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈষম্যের শুল্ক না হলে আমরা সেটা করে যাব।’
চীনের সঙ্গে ব্যবসা নিরুৎসাহিত করতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো শর্ত দিচ্ছে কি না, প্রশ্ন করা হলে উপদেষ্টা কোনো উত্তর দেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট নিয়ে কোনো প্রশ্নের জবাব এখন দেব না।’
বাণিজ্য উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, বৈঠকে বাণিজ্য উপদেষ্টা ব্যবসায়ীদের কাছে এই শুল্ক ইস্যুতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় সে বিষয়ে মতামত জানতে চান। তবে এই মতামত দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা যখন যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া এবং শর্তগুলো কী জানতে চেয়েছেন তখন এ বিষয়ে তাদেরকেও নন-ডিসক্লোজার ইস্যু তুলে কিছু বলা হয়নি। তবে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, শুল্ক চুক্তির শর্তে শুধু বাণিজ্য ইস্যুই নয়, আমেরিকা বেশ কিছু নন-ট্যারিফ ইস্যু নিয়ে বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দিয়েছে। যেগুলো আসলে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করেছে, যা সরকার এখন না পারছে মানতে, না পারছে বলতে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌক্তিক শুল্কহারের কথা বলা হচ্ছে, আসলে কত শতাংশ শুল্ককে যৌক্তিক মনে করছেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘শূন্য’। সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার যদি তাদের চুক্তির শর্তগুলোই না বলে তাহলে কীভাবে তারা এ বিষয়ে যৌক্তিক মতামত প্রদান করবে।
এ সময় বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সর্বশেষ তিন দিনের নেগোশিয়েশনে আমরা খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। আমরা খুব গুরুত্ব দিচ্ছি, যাতে আমাদের বড় শুল্কের আঘাত না আসে। আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি।’
৭ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক পুনঃআরোপিত হয়েছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সঙ্গে দুই দফা আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় ৯-১১ জুলায় তিন দিনের বৈঠক হয়। এরপর রবিবার যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে ফিরেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। সঙ্গে ছিল বাণিজ্য সচিবসহ একটি প্রতিনিধিদল।
অন্যদিকে গতকাল সংবাদ সম্মেলনের আগে দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। এ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যে পাল্টা শুল্ক চুক্তির খসড়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অ্যান্ড সিইও ড. মাসরুর রিয়াজ, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কম্পোনেন্ট ম্যানেজার ড. মোস্তফা আবিদ খান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী (পারভেজ), অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরসহ আরও অনেকে।