দীর্ঘদিন ধরে চলা আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলীকে অবশেষে অপসারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল মঙ্গলবার ব্যাংকটির চেয়ারম্যান বরাবর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো এক চিঠির মাধ্যমে এ অপসারণের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলীর বিরুদ্ধে বেনামি ঋণ বিতরণ, গ্রাহক আমানতের অর্থ লোপাট, জাকাত ফান্ডের অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্তেও প্রমাণিত হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। আর্থিক কেলেঙ্কারি ব্যাংকটির আর্থিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলী ২০১৫ সালের ৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে দুই দফায় তার মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার নেতৃত্বাধীন মেয়াদই হয়ে ওঠে ব্যাংকের আর্থিক বিপর্যয়ের মূল কারণ। অভ্যন্তরীণ অডিট, তদন্ত প্রতিবেদন ও পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত তাকে পদ থেকে অপসারণ করা হলো।
চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলী বাধ্যতামূলক ছুটিতে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরপর গত জুন মাসে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটি তাকে সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই গতকাল তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ থেকে অপসারণ করা হলো।
বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে অনিয়মে জড়িত উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এ অপসারণকে সেই ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি দৃষ্টান্তমূলক বার্তা দিয়েছে যে, ব্যাংক পরিচালনায় অনিয়ম, দুর্নীতি বা স্বেচ্ছাচারিতার কোনো জায়গা নেই বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেশ কিছু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বড় পরিবর্তন আনা হয়। তার মধ্যে অন্যতম ছিল ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ ছিল বিগত সরকারের বিতর্কিত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ; যার বড় সহযোগী ছিল এমডি ওয়াসেক মো. আলী।
বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় একের পর এক গুরুতর অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসে। ২০২৫ সালের ১ জুন অনুষ্ঠিত ১০৭তম অডিট কমিটির সভায় এসব অনিয়মের বিস্তারিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে উঠে আসে, এমডি ওয়াসেক মো. আলী ব্যাংকের শীর্ষ পদে থেকে একাধিক আর্থিক অনিয়মে জড়িত ছিলেন। অজ্ঞাত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ ও বিনিয়োগ দেওয়া হয়, যেগুলোর বিপরীতে সঠিক কাগজপত্র, জামানত বা কোনো যাচাই-বাছাই ছিল না। এ ছাড়া সীমা ছাড়িয়ে অতিরিক্ত বিনিয়োগ, বন্ধকি সম্পত্তির অতিমূল্যায়ন, স্থায়ী আমানতের বিপরীতে নিয়মবহির্ভূতভাবে টাকা উত্তোলন এবং অতিরিক্ত মুনাফা বিতরণ এসব কার্যক্রম ব্যাংকটিকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে তোলে।