যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের জন্য ১৭টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ইউনিট পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই সিস্টেমগুলো রাশিয়ার লাগাতার আকাশ হামলার মোকাবেলায় আদৌ যথেষ্ট হবে কি?
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট কীভাবে কাজ করে?
প্রতিটি প্যাট্রিয়ট ইউনিট কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সর্বোচ্চ ৩২টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। রুশ ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুটে এলে এগুলো শব্দের চেয়ে বেশি গতিতে ছুটে গিয়ে টার্গেট ভেদ করে। কিয়েভে বসবাসকারী কিশোর ইহোর লিসেঙ্কো আল জাজিরাকে বলেন, ‘এই বিস্ফোরণের শব্দই আমাকে নিরাপদ বোধ করায়।’
ইউক্রেনে প্যাট্রিয়টের আগমন ও সাফল্য
২০২৩ সালের এপ্রিলেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের কাছ থেকে প্রথম প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা পায় ইউক্রেন। তারপর থেকে এই ব্যবস্থা রাশিয়ার কুখ্যাত কিনঝাল (খঞ্জর) মিসাইল, অন্যান্য ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ভূপাতিত করতে সফল হয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একসময় বলেছিলেন, কিনঝালের গতি শব্দের চেয়ে ১০ গুণ বেশি, তাই এটি কোনো পশ্চিমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাগালের বাইরে। কিন্তু প্যাট্রিয়ট বারবার সেই দাবিকে ভুল প্রমাণ করেছে।
তবে সিস্টেমটি দুর্ভেদ্য নয়। গত এপ্রিল মাসে কিয়েভে এক হামলায় রাশিয়ার ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র একটি দুই তলা ভবন ধ্বংস করে, যাতে ১২ জন নিহত ও ৮৭ জন আহত হন।
ট্রাম্প ও ইউরোপের অবস্থান
সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট দেব, যা তাদের খুব প্রয়োজন। পুতিন সুন্দর কথা বলেন, কিন্তু রাতে সবাইকে বোমা মারেন।’
পরদিন তিনি নেটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকে জানান, এসব প্যাট্রিয়ট সিস্টেম একটি পশ্চিমা মিত্র দেশের কাছ থেকে আনা হবে, যারা এগুলো সরবরাহে প্রস্তুত।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জও জানান, বার্লিন অতিরিক্ত প্যাট্রিয়ট সংগ্রহে আগ্রহী।
বিশ্লেষকরা কী বলছেন?
কিয়েভের গবেষণা সংস্থা পেন্টার প্রধান ভলোদিমির ফেসেনকো বলেন, ‘রাশিয়া আগে দূরপাল্লার অস্ত্র নিয়ে ‘‘লাল রেখা’’ নিয়ে কথা বলত, কিন্তু প্যাট্রিয়ট নিয়ে এমন কিছু বলছে না। তবে সমস্যা শুধু প্যাট্রিয়ট নয়। এখন সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ ড্রোন।’
শতাধিক ড্রোন নিয়ে আকাশে একযোগে আক্রমণ চালায় রাশিয়া। ইউক্রেনের সাবেক উপপ্রধান সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহোর রোমানেঙ্কো বলেন, ‘আমাদের অন্তত ২৫টি প্যাট্রিয়ট ইউনিট দরকার, তবে সবচেয়ে জরুরি হলো ড্রোন আটকানোর উপযুক্ত প্রযুক্তি।’
ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ও প্রযুক্তির ঘাটতি
ড্রোন যুদ্ধ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই প্রোনিন বলেন, ‘প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখনো অপেশাদার পর্যায়ে আছে। আমার তৈরি ড্রোন ইন্টারসেপ্টর বাস্তবে সফল হলেও, তারা আগ্রহ দেখায়নি।’
ইউক্রেনে বর্তমানে মাত্র দুটি জার্মান-উৎপাদিত স্কাইনেক্স প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে, যার প্রতিটিতে রয়েছে ৩৫ মিমি কামান যা প্রতি মিনিটে ১, হাজার রাউন্ড ছোড়ার ক্ষমতা রাখে। এই সিস্টেম দিয়ে ছয়টি রুশ ‘গেরান’ ড্রোন ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, কেবল প্যাট্রিয়ট দিয়ে রুশ আকাশ আক্রমণ রোধ সম্ভব নয়। ইউক্রেনের প্রয়োজন আরও ড্রোন ইন্টারসেপ্টর, দ্রুতগামী প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্ম, এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তি—যা একযোগে আকাশসীমায় ঘোরাফেরা করা ড্রোন ঠেকাতে পারে।
অন্তত ৫০০ কিমি প্রতি ঘণ্টা গতির ইন্টারসেপ্টর প্রয়োজন হবে বলেই মত রোমানেঙ্কোর। কারণ, রাশিয়া এখন জেট ইঞ্জিনচালিত নতুন প্রজন্মের ড্রোন মোতায়েন করছে, যা আরও দ্রুত ও ভয়ংকর।
সার্বিকভাবে, ট্রাম্পের দেওয়া নতুন প্রতিশ্রুতি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় তাৎক্ষণিক কিছু সহায়তা দিলেও, বিশ্লেষকদের মতে এটি মূল সমস্যার সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেনকে আরও উন্নত, বহুমুখী ও সংখ্যায় অনেক বেশি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি গড়ে তুলতে হবে।