পরিসংখ্যানের মান নিশ্চিতে স্বাধীন কমিশন করা হবে

একটি দেশের উন্নয়নে সঠিক পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিসংখ্যান যদি ভুল হয়, তাহলে সরকারের গৃহীত সব ধরনের পদক্ষেপেও ভুল হবে। তাই আগামী দিনে গুণগত মানসম্পন্ন ও পরিচ্ছন্ন পরিসংখ্যান প্রণয়ন নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন পরিসংখ্যান কমিশন গঠন করা হবে। এই কমিশন সরকারের নির্বাহী কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে কাজ করবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) শক্তিশালীকরণে গঠিন টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এ কথা বলেছেন। বিবিএসকে শক্তিশালীকরণে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তা নির্ধারণে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছে টাস্কফোর্স। তারই অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার রাজধানীর পরিসংখ্যান ব্যুরো মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে টাস্কফোর্স। এ সময় টাস্কফোর্সের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, যে কোনো দেশের জন্য পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিগত সময়ে নানা মহল থেকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তৈরি করা বিভিন্ন পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিসংখ্যানের গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও এ বিষয়টি গুরুত্ব অনুধাবন করেছে। যে কারণে পরিসংখ্যানের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি আট সদস্যবিশিষ্ট টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্স বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করবে। ওই প্রতিবেদনে বিবিএসকে শক্তিশালীকরণের জন্য বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হবে।

তিনি বলেন, ‘গুণগত পরিসংখ্যান পেতে হলে ব্যুরোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য বিদ্যমান পরিসংখ্যান আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার বিষয়ে কমিশন সুপারিশ করবে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ যে সুপারিশটা করা হবে, তা হচ্ছে পরিসংখ্যান প্রণয়ন কাজের স্বাধীনতা নিশ্চিতে একটি স্বতন্ত্র পরিসংখ্যান কমিশন গঠন করা হবে।’ টাস্কফোর্সের কর্মপরিধি বিষয়ে তিনি বলেন, পরিসংখ্যানের মান নিশ্চিতকরণ, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং এগুলোর সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।

এ সময় সাংবাদিকরা আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, বিবিএসে নানা ধরনের সমস্যা বিদ্যমান। প্রতিষ্ঠানটিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের তেমন প্রাধান্য দেওয়া হয় না। বিশেষ করে পরিসংখ্যান ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত পদোন্নতির সুযোগ নেই। বর্তমানে দেশের প্রতিটি ক্যাডারের ক্ষেত্রে গ্রেড-১ সমপর্যায়ের অন্তত একটি পদ থাকলেও পরিসংখ্যান ক্যাডারের ক্ষেত্রে সেটি নেই। ফলে মেধাবী ছেলেমেয়েরা এই ক্যাডারে আসতে চান না। তাছাড়া পরিসংখ্যান ব্যুরোর কাজে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এসআইডি) অনেক হস্তক্ষেপ বিদ্যমান। ফলে অনেক বিষয়ে ব্যুরো সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।

বক্তারা বলেন, পরিসংখ্যান একটি বিশেষায়িত বিষয়। কিন্তু এই সংস্থার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যাদের বসানো হয়, তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন। মূলত সরকারের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরই উচ্চপদে বসানো হয়। আর এসআইডির প্রায় পুরোটাই প্রশাসন ক্যডারের দখলে। সাংবাদিকরা পরিসংখ্যান প্রকাশ করার কাজে আধুনিকায়নের ওপর জোর দেন। বিশেষ করে বিবিএসের ওয়েবসাইটটি ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেন তারা।

বক্তারা বলেন, আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান প্রকাশ করার একমাত্র সংস্থা বিবিএস। তবে বিবিএস সব পরিসংখ্যান নিজে প্রণয়ন করে না। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরও খাতভিত্তিক নানা পরিসংখ্যান প্রণয়ন করে থাকে। ওইসব সংস্থার তৈরি করা উপাত্তের সঙ্গে বিবিএসের উপাত্তের পার্থক্য দেখা দেয়। ফলে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায়। এই বিভ্রান্তি রোধে অন্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে বিবিএসের পরিসংখ্যান প্রকাশ করার পরামর্শ দেন তারা। তারা আরও উল্লেখ করেন, বিবিএসে প্রকল্পভিত্তিক কাজ হয় বেশি। আর প্রকল্পে দুর্নীতির সুযোগ থাকে বেশি। তাই দুর্নীতি পরিহারের জন্য তারা বিবিএসের মৌলিক কাজগুলো রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেন।

সবশেষে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বিভিন্ন অংশীজনের মতামত ও সুপারিশসমূহ একত্র করে এগুলো সুপারিশ আকারে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হবে। আগামী মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হবে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্বাধীন কমিশন গঠনসহ পরিসংখ্যানের গুণগত মানোন্নয়নে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেবে সরকার।