গোপালগঞ্জে সংঘর্ষ

মামলায় আসামি ৫৭৫, কারফিউর মধ্যে গ্রেপ্তার ১৬৪

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনায় ৭৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৫০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে গোপালগঞ্জ সদর থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি করেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন। মামলার আসামিদের ধরতে নদীপথে টহল জোরদার করেছে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী। এদিকে কারফিউর সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। শনিবার (আজ) সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ বহাল থাকবে। এছাড়াও এই সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ১৬৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এনসিপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় গতকাল পর্যন্ত পাঁচজন নিহত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রমজান মুন্সি (৩৫) মারা যান। নিহত রমজান মুন্সি গোপালগঞ্জ শহরের থানাপাড়ার আকবর মুন্সির ছেলে। এর আগে ঘটনার দিন চার যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তারা হলেন - জেলা শহরের উদয়ন রোডের সন্তোষ সাহার ছেলে দীপ্ত সাহা (২৫), মৌলভীপাড়ার কামরুল কাজীর ছেলে রমজান কাজী (২৪), সদর উপজেলার আড়পাড়া এলাকার আজাদ তালুকদারের ছেলে ইমন তালুকদার (১৮) ও টুঙ্গিপাড়ার ইন্দ্রিস মোল্লার ছেলে সোহেল মোল্লা (৩৫)। সেদিন আহত হন সাংবাদিক ও পুলিশসহ শতাধিক মানুষ।

গোপালগঞ্জে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেদিন প্রথমে ১৪৪ ধারা জারি করলেও তাতে কাজ না হওয়ায় বুধবার রাত আটটা থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কারফিউ দেয় সরকার। যা পরবর্তীতে সময় ফের বাড়ানো হয়েছে। চলমান কারফিউ শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বহাল থাকবে। গতকাল জেলা প্রশাসনের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে গোপালগঞ্জে কারফিউ অমান্য করায় বুধবার রাতে যৌথবাহিনীর অভিযানে ১৪ জনকে আটক করা হয়েছে। আটকের পর তাদের গোপালগঞ্জ সদর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিকে কারফিউ ঘোষণার পর বুধবার রাত থেকে গোপালগঞ্জ ছিল অনেকটাই ভূতুড়ে নগরী। সীমিত আকারে রিকশা চলাচল করলেও দেখা যায়নি অন্যকোনো যানবাহন। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হননি সাধারণ মানুষ। শুক্রবার দিনব্যাপী সেখানে থমথমে পরিবেশ দেখা যায়। তবে কারফিউয়ের মধ্যেও সড়কে দেখা গেছে মানুষের উপস্থিতি। সংখ্যায় কম হলেও জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া এসব মানুষ বিভিন্ন গন্তব্যে ছুটছেন। 

শহরের বড় বাজারের ফল ব্যবসায়ী রতন সাহা বলেন, দোকান খুলতে না পাড়ায় মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছি। তিনদিনে প্রায় ৩০ হাজার টাকার ফল পচে গেছে। শুক্রবার তিন ঘণ্টার জন্য দোকান খুলেছি। কিন্তু এসময় আর কতটুকু বিক্রি করা যায়। আমরা চাই, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসুক।

গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) ড. রুহুল আমিন সরকার বলেন, সদর থানায় পুলিশ বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করেছে। সেখানে ৭৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এখনো গোপালগঞ্জের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। চলছে যৌথবাহিনীর অভিযান, গতকাল বিকেলে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরমধ্যে সদর থানায় ৪৫ জন, মুকসুদপুর থানায় ৬৬ জন, কাশিয়ানী থানায় ২৪ জন, টুঙ্গিপাড়া থানায় ১৭ জন এবং কোটালীপাড়া থানায় ১২ জন। তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

মামলার বিষয়ে গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি মীর মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ১৬ জুলাই সকালে এনসিপির পদযাত্রা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জ-টেকেরহাট আঞ্চলিক সড়কের গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার উলপুরে পুলিশ নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। এসময় নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের নেতৃত্বে একদল লোক পুলিশের ওপর হামলা করে। তারপর তারা পুলিশ সদস্যদের মারপিট ও গাড়ি ভাঙচুর করে অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় পুলিশের পরিদর্শক আহম্মেদ আলী বিশ্বাসসহ ৫ পুলিশ আহত হন।

নৌবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট সাজ্জাদ ও কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার হারুন-অর-রশীদ  বলেন, গোপালগঞ্জে এনসিপি নেতাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও আসামিদের ধরতে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে। দুষ্কৃতকারীরা যাতে নদীপথে পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য গোপালগঞ্জ জেলার নদীপথে বিশেষ টহল দেওয়া হচ্ছে। এ টহলে কোস্টগার্ডের দুটি বোট ও নৌবাহিনীর একটি বোট অংশ নিয়েছে।

গত বুধবার গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশ ঘিরে ব্যাপক সহিংসতা ও নাশকতা চালান ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এমনকি গোপালগঞ্জ কারাগারেও হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইলে তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান দলটির ক্যাডাররা। এতে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় গোপালগঞ্জ শহর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গোপালগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। বুধবার রাত ৮টা থেকে কারফিউ বহাল রয়েছে।

এনসিপির পূর্বঘোষিত পদযাত্রা ও সমাবেশের আয়োজন ছিল গোপালগঞ্জ শহরের পৌর পার্কে। এ নিয়ে সেখানে সার্বিক প্রস্তুতির পাশাপাশি সমাবেশ মঞ্চ তৈরি করা হয়। কিন্তু আগের দিন রাত থেকেই আওয়ামী লীগের লোকদের এনসিপির কর্মসূচি পণ্ড করতে অনলাইন-অফলাইনে সংগঠিত হতে দেখা যায়। এর মধ্যে সকালে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নে টহলরত পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেয় নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান পিয়ালের সমর্থকেরা। এরপর সদর উপজেলার কংশুর এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়িবহরে হামলা ও ভাঙচুর করে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা। দুপুরে গোপালগঞ্জ শহরের পৌর পার্কে এনসিপির সমাবেশের মঞ্চ ভাঙচুর করে এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এ উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে এনসিপির নেতা-কর্মীরা সেখানে যায় এবং সমাবেশ করেন। কিন্তু সমাবেশ শেষে বেরিয়ে যাওয়ার পথে শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা আবার এনসিপির গাড়িবহরে হামলা চালায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে হামলাকারীদের ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের লোকেরা। তখন অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। এসময় অনেক সাংবাদিকও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মাঠে নামে সেনাবাহিনী। পরে গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রহরায় বের হয় এনসিপির নেতাদের গাড়িবহর। মাদারীপুরের নির্ধারিত সমাবেশ স্থগিত করে নেতারা চলে যান খুলনায়।