জামায়াতের সমাবেশ ঘিরে সতর্ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আজ শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘জাতীয় সমাবেশ’ করবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির উদ্দেশ্য বড় ধরনের সমাবেশ করে রাজনীতির মাঠে নতুনভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করার পাশাপাশি নিজেদের সক্ষমতা দেশ-বিদেশে তুলে ধরা। পাশাপাশি সংসদ নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন আদায়, নির্বাচনের আগে সংস্কার, গণহত্যার বিচারসহ সাত দফা দাবির বাস্তবায়নে সরকারকে চাপ দেওয়া।

এদিকে জামায়াতের কর্মসূচি সামনে রেখে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাদ আলী দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর কর্মসূচি কেন্দ্র করে সতর্ক অবস্থানে থাকবে পুলিশ। নেওয়া হয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। রাজধানীর প্রবেশ পথসহ সমাবেশস্থলের আশপাশে টহল জোরদার থাকবে। ইতিমধ্যে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। জামায়াতের নেতারা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ সফল করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। আজকের সমাবেশে স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি জনসমাগ ঘটবে। সমাবেশে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেবেন। সমাবেশের মূল মঞ্চে জামায়াতের জাতীয় নেতা, জুলাইয়ে শহীদ পরিবারের প্রতিনিধি এবং অন্যান্য দলের নেতারা থাকবেন। এতে রাজধানীসহ সারা দেশের নেতাকর্মীরা অংশ নেবেন।

এদিকে গতকাল শুক্রবার বিকেলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ অন্য নেতারা সমাবেশস্থল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পরিদর্শন করেছেন। এ সময় গোলাম পরওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা আবহাওয়া ভালো দেখছি এজন্য আলহামদুলিল্লাহ। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি যাতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকে।’

এর আগে সকালে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সভাপতিত্বে উপকমিটির এক বৈঠক হয়। বৈঠকে অংশ নেন কেন্দ্রীয় প্রচার, মিডিয়া ও আইটি, ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণের প্রচার, মিডিয়া ও আইটি এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রচার, মিডিয়া ও আইটি বিভাগের নেতারা। বৈঠকে দলের প্রচার, মিডিয়া ও আইটি উপকমিটির সার্বিক কাজের পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি জাতীয় সমাবেশ সুশৃঙ্খল ও সফলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দায়িত্বশীলদের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়।

যে ৭ দফা দাবিতে আজকের সমাবেশ : ১. সব গণহত্যার বিচার; ২. প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কার; ৩. জুলাই সনদ ও ঘোষণাপাত্র বাস্তবায়ন; ৪. জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের পরিবারের পুনর্বাসন; ৫. সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন; ৬. প্রবাসীদের ভোট প্রদানের ব্যবস্থা এবং ৭. জাতীয় নির্বাচনের আগে সমতাভিত্তিক রাজনৈতিক পরিবেশ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করা।

জামায়াতের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এতদিন ঢাকার পুরানা পল্টন, বায়তুল মোকাররম, পল্টন ময়দানসহ রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় দলীয় অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কখনোই এককভাবে বড় সমাবেশ করেনি দলটি। গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠেন দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। আজ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ‘জাতীয় সমাবেশ’ করার মাধ্যমে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা জানান দিতে চাই।

এর আগে জামায়াতের সমাবেশ ঘিরে প্রস্তুতির বিষয়ে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল গত বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘জাতীয় সমাবেশ সফল করে তোলার লক্ষ্যে একটা মূল বাস্তবায়ন কমিটি এবং এর অধীনে আরও আটটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। সারা দেশে লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, শপিং মলসহ বিভিন্ন জায়গায় ভ্রাম্যমাণ মাইকের মাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সারা দেশে পাড়া-মহল্লায় মিটিং ও মিছিল চলছে। ভ্রাম্যমাণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গানের সুর ও নাটকের মাধ্যমে সমাবেশের বার্তা দেশবাসীর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০টি পয়েন্টে প্রায় ছয় হাজার স্বেচ্ছাসেবক বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্ব পালন করবে। স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য আলাদা ড্রেস থাকবে। ঢাকা শহরের বাইরে থেকে ঢাকা এবং পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে যারা আসবেন, তাদের গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য কমপক্ষে ১৫টি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রেখেছি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চতুর্দিকে ভেতরে এবং বাইরে মিলিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ১৫টি মেডিকেল বুথ থাকবে। একাধিক বেড সংবলিত প্রতিটি বুথে দুজন করে ডাক্তার থাকবেন। জরুরি ওষুধ এবং অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের ব্যবস্থা করেছি।’

গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জাতীয় সমাবেশের কার্যক্রমে আইটি টিম এবং লাইভ প্রচারের জন্য ড্রোন টু ড্রোন ক্যামেরার সাহায্যে সমাবেশে উচ্চমানের ভিডিও ধারণ এবং সমাবেশস্থলে বক্তব্য এলইডি স্ক্রিনে প্রদর্শন করা এবং ফেসবুক, ইউটিউবসহ সব সামাজিকমাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, জনসভার শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজধানীর বাইরে থেকে আসা সাধারণের জন্য সড়ক, নৌ ও রেলপথে নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য আমরা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, পুলিশ কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের সহযোগিতা চেয়েছি। নেতারা তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে লিখিতভাবে প্রয়োজনীয় চাহিদা জানিয়েছেন এবং তাদের সহযোগিতা চেয়েছেন। ইতিমধ্যে তারা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অথচ তিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মাত্র চার দিন আগে আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাহী আদেশে ‘সন্ত্রাসী সত্তা’ হিসেবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হলে সে সময় জামায়াতও রাজপথে ব্যাপক সক্রিয় হয়। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাজনীতির মাঠে সরব দীর্ঘদিন কোণঠাসা থাকা দলটি রাজনৈতিক, সামাজিক, কূটনৈতিক ও সাংগঠনিকসহ চতুর্মুখী তৎপরতায় ব্যস্ত সময় পার করছে তারা। দেড় দশকেরও বেশি সময় ব্যাকফুটে থাকা জামায়াত তাদের কর্মকা- বহুগুণে বাড়িয়েছে।

নিয়ম মেনেই ৩২ লাখ টাকায় ট্রেন ভাড়া নিয়েছে জামায়াত : রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি

জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশ উপলক্ষে দলটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চার জোড়া বিশেষ ট্রেন পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। বিষয়টি কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

তবে রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ বলছে, এতে ট্রেন পরিচালনার স্বাভাবিক নিয়মের কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটেনি। অতীতে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্র্তৃক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বড় কর্মসূচি উপলক্ষে তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ ট্রেন পরিচালনার নজির রয়েছে। সমাবেশ উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী চার জোড়া এ বিশেষ ট্রেনের প্রায় ৩২ লাখ টাকা ভাড়া অগ্রিম পরিশোধ করেছে।

গতকাল শুক্রবার রেলপথ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা রেজাউল করিম সিদ্দিকীর পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় জানায়, অতীতে রেলওয়ে কর্র্তৃক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বড় কর্মসূচি উপলক্ষে তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ ট্রেন পরিচালনার নজির রয়েছে। রাজনৈতিক দলের জনসমাবেশ বা অনুরূপ কর্মসূচির কারণে তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট ভাড়া আদায় সাপেক্ষে বিশেষ ট্রেন পরিচালনার অনুমতি প্রদান বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি নৈমিত্তিক কাজ।

মন্ত্রণালয় বলছে, এ ধরনের বিশেষ ট্রেন পরিচালনার অনুমতি প্রদান না করলে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী নিয়মিত ট্রেনের টিকিটবিহীন যাত্রী নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন ও দুরূহ হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা কাক্সিক্ষত গন্তব্যে যাওয়ার জন্য টিকিটের পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ পান না বিধায় বিনা টিকিটে ভ্রমণের প্রবণতা বেড়ে যায়। এতে রেলওয়ে কাক্সিক্ষত রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে বিশেষ ট্রেন পরিচালনার অনুমতি প্রদান করার ফলে নির্দিষ্ট ভাড়া পরিশোধ সাপেক্ষে দলের নেতাকর্মীরা ওই ট্রেনে ভ্রমণ করতে পারবেন। এতে বাংলাদেশ রেলওয়ে যেমন কাক্সিক্ষত রাজস্ব আয় করতে সক্ষম হবে, অন্যান্য ট্রেনের সাধারণ যাত্রীরাও তেমনি বাড়তি ভোগান্তি থেকে পরিত্রাণ পাবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।

এ ছাড়া চার জোড়া বিশেষ ট্রেন সাপ্তাহিক অফ-ডে থাকা নির্ধারিত রেক দ্বারা পরিচালনা করা হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এতে আরও বলা হয়, শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় যাত্রীদের স্বাভাবিক চাহিদা সাধারণত কম থাকে। ফলে এসব ট্রেন পরিচালনার জন্য নিয়মিত চলাচলকারী কোনো ট্রেনের যাত্রা বিঘিœত হবে না। অর্থাৎ এসব রুটে নিয়মিত চলাচলকারী সাধারণ যাত্রীদের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশ উপলক্ষে তারা প্রায় ৩২ লাখ টাকায় বিশেষ ট্রেনের ভাড়া অগ্রিম পরিশোধ করেছে, যাতে করে রেলের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানায় মন্ত্রণালয়।

বিষয়টিকে রেলওয়ের একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, এর সঙ্গে দলীয় রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে মন্ত্রণালয় বলছে, আগের প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও যেকোনো রাজনৈতিক দলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অনুরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো কিংবা অপপ্রচারের কোনো সুযোগ নেই।

দলের জাতীয় সমাবেশে নেতাকর্মী আনতে চার জোড়া ট্রেন ভাড়া করেছে জামায়াতে ইসলামী। এসব ট্রেন চট্টগ্রাম-ঢাকা-চট্টগ্রাম, রাজশাহী-ঢাকা-রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ-ঢাকা-সিরাজগঞ্জ এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ-ঢাকা রুটে একবার করে চলবে।