জুলাই শহীদ ছেলের কবরের পাশে ঘর পেলেন মা

‘আমার ছেলে তো আর ফিরবে না। তার কবরের পাশে এখন মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই পেয়েছি, এটাই শান্তি। বাকি জীবনটা এই কবরটার যত্ন নিয়েই কাটিয়ে দেব’— কথাগুলো জুলাই আন্দোলনে নিহত শহীদ জাকির হোসেনের মা মিছিলি বেগমের।

নেত্রকোনার দুর্গাপুরের প্রত্যন্ত বাকলজোড়া গ্রামের মিছিলি বেগমের একমাত্র সন্তান জাকির হোসেন। স্বপ্ন ছিলো নিজের উপার্জনের টাকায় গ্রামে মায়ের জন্য তৈরি করবেন ঘর, কিনে দেবেন সামান্য জমি। স্বপ্নের অর্থ খুঁজে নেত্রকোনা থেকে ভাগ্য টেন নিয়েছিল রাজধানী শহর ঢাকায়। ব্যস্ত নগরীর হাজারো কর্মব্যস্ত মানুষের মতই সামান্য শ্রমিকের কাজ জুটেছিল শহীদ জাকির হোসেনের। 

সামান্য আয় তাতেই নিজের খরচ মিটিয়ে বাকিটুকু পাঠাতেন মায়ের কাছে। ঘাম ঝরানো কষ্টের টাকার সামান্য সুখ যেন বেশিদিন স্থায়ী হলো না। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনেই থমকে গেছে শহীদ জাকির হোসেনের জীবন আর স্বপ্নের যাত্রা। 

চব্বিশের ২১ জুলাই ঢাকা চট্টগ্রাম সড়কে কাঁচপুর এলাকায় ছাত্র জনতার আন্দোলনের পুলিশের চালানো গুলিতে নিহত হন শহীদ জাকির হোসেন। গ্রামে নিজের সামান্য আয়ে কেনা জমিতে সমাধিস্থ হয়েছে জাকির। তবে মৃত্যুর প্রায় এক বছরেরও একমাত্র ছেলেকে হারানো যন্ত্রণায় পুড়ছে মা মিছিল বেগম। পাগল প্রায় মায়ের শেষ ইচ্ছে ছিল ছেলের কবরের পাশেই যেন মিলে আশ্রয়।

গৃহহীন মিছিল বেগমের শেষ ইচ্ছা খবর গণমাধ্যমের বদৌলতে জানতে পেরে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। মৃত্যুর এক বছরের মাথায় জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের মাধ্যমে ছেলের কবরের পাশেই পাকা নতুন ঘর তৈরি করে দিচ্ছে প্রশাসন।

শুক্রবার (১৮ জুলাই) বিকালে ঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন নেত্রকোণার জেলা প্রশাসন বনানী বিশ্বাস। রঙিন টিনের এই বাড়িতে রয়েছে থাকার জন্য দুই ঘর, রান্না ঘর, বারান্দা, টয়লেটসহ বিশুদ্ধ খাবার পানি সুবিধা। অনেকটা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের আদলে তৈরি এই বাড়ি। এছাড়াও কবরের চারপাশে রয়েছে কিছুটা খোলা জায়গাও। উদ্বোধনের পর বাড়িটি ঘুরে দেখেন জেলা প্রশাসনসহ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা।

স্থানীয়রা জানান, শৈশবেই বাবাকে হারিয়ে মায়ের হাত ধরে ঢাকায় চলে যান শহীদ জাকির হোসেন। ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামই ছিলো জীবনের একমাত্র সঙ্গী। দিনমজুরের কাজ করে কোন রকমে সংসার চালাতেন। কষ্টার্জিত উপার্জনে গ্রামে কেনা জমিতে ঘর তোলার স্বপ্ন শহীদ জাকির হোসেনের। ছেলের মৃত্যুর পর মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় মা মিছিলি বেগম আশ্রয় নেন আত্মীয়ের বাড়িতে। তবে নতুন ঘর নির্মাণ করে দেয়ায় প্রশাসনকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা এমন উদ্যোগ শুধু ঘর নয়, একজন শোকাহত বৃদ্ধ মায়ের শেষ বয়সে বেঁচে থাকার অবলম্বন বলেও জানান।

আর ছেলের কবরের পাশে ঘর পেয়ে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে মিছিলি বেগম বলেন, সরকার একটা ঘর দিছে আমার ছেলের কবরের সামনে। কবরটা যেনো হেফাজতে রাখতে পারি অন্তত এটা দেখতেই আমার শান্তি। আমার আর মনের কোন আশা নেই। ‌আমি হোটেলে কাজ করে আমার ছেলেকে মানুষ করেছি। ১২০ টাকার সামান্য চাকরি করতাম তাতেই ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় থেকে বাড়ি ভাড়া দিয়ে কোন রকমে জীবন চালিয়েছি। কিন্তু ছেলেটা বড় না হতেই চলে গেলে। এই দিন আমি কেন দেখলাম। আল্লাহ আমার ছেলেরে রাখতো আমি চলে যেতাম। আমার ছেলে জীবিত থাকতো। 

জেলা প্রশাসক বনানী বিশ্বাস জানান, নেত্রকোনা জেলায় জুলাই বিপ্লবে ১৭ জন শহীদ হয়েছেন এর মধ্যে জাকির হোসেন একজন। জাকির হোসেন দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন আমরা তার আত্মত্যাগকে মনে রাখব। জাকিরের একমাত্র মা রয়েছে আমরা আর যেন কোন অসুবিধা না হয় সে বিষয়টি আমরা নজরে রাখছি। আমরা আগেই ঘোষণা দিয়েছিলাম যাদের ঘর নেই তাদেরকে ঘর করে দেবো। আমরা জেলায় চারটি ঘর নির্মাণ করছি এর মধ্যে জাকির হোসেনের মায়ের ঘর একটি। জাকির হোসেনের মায়ের কাছে আমরা ঘরটি হস্তান্তর করে দিয়েছি। আমাদের একটাই অনুরোধ এখানকার স্থানীয় যারা রয়েছেন তারা খোঁজ-খবর রাখবেন যাতে করে জাকিরের মায়ের কোন সমস্যায় না পড়ে। কেননা গৃহ নির্মাণের জমিটাও কিন্তু বেদখল ছিলো। আমরা সেই অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করে এই গৃহটি নির্মাণ করে দিয়েছি। এখনো জমি রয়েছে যেটি বেদখল হয়ে রয়েছে। যেহেতু এই বৃদ্ধ মায়ের কেউ নেই সে কারণে দুর্বৃত্তরা সুযোগ পাচ্ছে। আমাদের সবার মনে রাখতে হবে জাকির দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে। তার মায়ের দায়িত্ব আমাদের সবার। সেই লক্ষ্য থেকেই আমরা এই ঘরটি নির্মাণ করে দিয়েছি। আর জাকিরের যে কবর রয়েছে সেটাও কিন্তু আমরা সরকারের তরফ থেকেই বাঁধাই করে দিবো।