ইউএনএইচআরের অফিস মানবাধিকার সুরক্ষা সহায়তায়

মানবাধিকারের সুরক্ষা ও বিকাশে সহায়তার লক্ষ্যে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের অফিস হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। একটি মিশন খোলার জন্য বাংলাদেশ সরকার তিন বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, মিশনটির লক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সংগঠনগুলোকে প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সক্ষমতা বৃদ্ধি, আইনি সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণের বাংলাদেশকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক তার মানবাধিকার-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পূরণে সহায়তা করা।

ঢাকায় এই মিশন স্থাপনের জন্য গত ১০ জুলাই সমঝোতা স্মারকের খসড়া অনুমোদন করে উপদেষ্টা পরিষদ। এর আগে থেকেই সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং আলেম সমাজ উদ্বেগ জানিয়ে এর বিরোধিতা করে আসছে।

তাদের অভিযোগ, বিশে^র খুবই অল্পসংখ্যক দেশে জাতিসংঘের এ ধরনের কার্যালয় রয়েছে। এ কার্যালয় থেকে মানবাধিকার রক্ষার নামে সমকামিতা ও অবাধ যৌনতা উসকে দিয়ে থাকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে এ ধরনের অফিস রয়েছে এমন দেশগুলো হলো বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, চাদ, কলম্বিয়া, গুয়াতেমালা, গিনি, হন্ডুরাস, লাইবেরিয়া, মৌরিতানিয়া, মেক্সিকো, নাইজার, ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও ইয়েমেন।

সরকারের এই উদ্যোগে ‘গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কা’ প্রকাশ করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ সে সময় ঘোষণা দেয়, বাংলাদেশে তারা জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় খুলতে দেবে না।

সংগঠনটির আমির শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী ৫ জুলাই ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘মানবাধিকারের’ নামে ইসলামি শরিয়াহ, পারিবারিক আইন ও ধর্মীয় মূল্যবোধে ‘হস্তক্ষেপের অপচেষ্টা’ করেছে। এসব হস্তক্ষেপ একদিকে যেমন জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত, অন্যদিকে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অনুভূতিরও পরিপন্থী। তাই বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় খুলতে দেওয়া হবে না।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘উদ্যোগটি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পটভূমিতে গৃহীত সংস্কার এবং জবাবদিহির প্রতি বাংলাদেশের অব্যাহত প্রতিশ্রুতিকেই প্রতিফলিত করে। আমরা স্বীকার করি, জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আদর্শিক অবস্থান নিয়ে সমাজের একটি অংশের উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। অনেক নাগরিক আমাদের জানিয়েছেন, যেকোনো আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে এই মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত।’

সরকারপ্রধানের দপ্তর বলছে, এরই পরিপ্রেক্ষিতে, ওএইচসিএইচআর মিশন মানবাধিকারের যেকোনো গুরুতর লঙ্ঘনের প্রতিরোধ ও প্রতিকার, বিগত সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর মনোনিবেশ করবে। এটি দেশের প্রতিষ্ঠিত আইনি, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কাঠামোর বাইরে থাকা কোনো সামাজিক এজেন্ডাকে উৎসাহিত করবে না।’

‘আমরা আশা করি, মিশনটি সবসময় স্বচ্ছতা প্রদর্শন করবে এবং স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রাখবে। জাতিসংঘ আমাদের সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় বাস্তবতার প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে বাংলাদেশে কাজ করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ,’ উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।

এতে আরও বলা হয়, সরকার এই চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করার সার্বভৌম কর্তৃত্ব সংরক্ষণ করে, যদি সরকার মনে করে যে এই অংশীদারত্ব আর জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

‘গত সরকারের সময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- এবং গণহত্যার দায়মুক্তির যেসব ঘটনা ঘটেছে, সে সময় যদি এ ধরনের একটি সংস্থার কার্যক্রম চলমান থাকত, তাহলে সেই অপরাধের অনেকগুলো ঘটনা হয়তো সঠিকভাবে তদন্ত, লিপিবদ্ধ এবং বিচার করা হতো। আজকের এ সময় মানবাধিকারের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি আদর্শের ওপর নয়, ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত।’

সরকারের ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘সরকার এই অংশীদারত্বকে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করার এবং আমাদের নাগরিকদের সুরক্ষা বৃদ্ধির একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে, যা আমাদের আইনের মাধ্যমে গঠিত ও মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হবে এবং আমাদের জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।’