গুলশানে অর্ধেক দামে ফ্ল্যাট নেন সাবেক প্রধান বিচারপতিও

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে এক বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম প্রায় ৩০ হাজার টাকা। অথচ তৎকালীন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সেখানে প্রায় দেড় লাখ বর্গফুট আয়তনের ৪৮টি ফ্ল্যাট ১৪ হাজার ৫০০ টাকা বর্গফুট দরে বরাদ্দ দিয়েছে। ফ্ল্যাটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সাবেক প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান মিঞাসহ ৪৮ জন ভিআইপির নামে। এতে সরকারের প্রায় ২৩০ কোটি টাকা গচ্চা গেছে। প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা দামের একেকটি ফ্ল্যাট কেনার টাকা সরকারি কর্মকর্তারা কোথায় পেয়েছেন, সেটিও সন্দেহজনক। এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে রাজউক চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সত্যতা জানতে দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট গত ১৮ জুন অভিযান পরিচালনা করেছে।

দুদকের তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলের পেছনে রাজউকের রূপসা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের আওতায় নিজেদের পছন্দের লোকজনসহ রাজনৈতিক নেতা, তাদের সন্তান, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ও বিচারকদের কম দামে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ আমলে নিয়ে সংস্থাটির এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের একটি টিম গুলশানে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা মিলেছে। এরপরই রূপসা প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটগুলো বাতিলের ব্যবস্থা নিতে রাজউক চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয় দুদক। গত ২ জুলাই পাঠানো ওই চিঠির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ও দুদকের প্রতিবেদন পাঠানো হয়।

দুদকের প্রতিবেদনের একটি কপি এ প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। তাতে দেখা গেছে, রূপসা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে প্রতিটি ফ্লোরে চারটি করে ফ্ল্যাট রয়েছে। ফ্ল্যাটের আয়তন ৩০৯৯ ও ৩০৬৮ বর্গফুট। ফ্ল্যাটগুলো ১৪ হাজার ৫০০ টাকা বর্গফুট দরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ৩০৬৮ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের দাম ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮৬ হাজার এবং ৩০৯৯ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের দাম ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। ফ্ল্যাটপ্রাপ্তরা মোট মূল্যের ৩০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তারা এত টাকা দিয়ে কীভাবে ফ্ল্যাট নিয়েছেন এবং তাদের আয়ের সঙ্গে অন্যান্য সম্পদ অর্জন সংগতিপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে কমিশনের অনুমোদন পেলে অনুসন্ধান শুরু করা হবে।

রাজউক ও দুদকের তথ্য বলছে, যে দামে রাজউক ৪৮টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিয়েছে তাতে রাজউকের কোষাগারে ২১৩ কোটি থেকে ২১৫ কোটি টাকা জমা হওয়ার কথা। এসব ফ্ল্যাট ৩০ হাজার টাকা বর্গফুট দরে বরাদ্দ দেওয়া হলে রাজউকের তহবিলে জমা হতো ৪৪১ কোটি থেকে ৪৪৬ কোটি টাকা বা তার বেশি। রাজউক এসব ফ্ল্যাট বাজারদর থেকে ২৩০ কোটি টাকা কমে নিজেদের লোকজনকে বরাদ্দ দিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে গতকাল রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলামের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।

রাজউক নির্মাণাধীন গুলশান অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের আওতায় গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলের পেছনে ৩৫ নম্বর রোডের সিডব্লিউঅ্যান্ডবি ৮ নম্বর প্লটে ৪৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। এসব ফ্ল্যাটের পাঁচটি মন্ত্রণালয় ও সরকারের জন্য সংরক্ষিত রেখে বাকি ৪৩টি ফ্ল্যাট বরাদ্দের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ওই বিজ্ঞপ্তির আলোকে ২৯৫ জন আগ্রহী ব্যক্তি ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। একটি আবেদনে ভুল থাকায় বাকি ২৯৪টি আবেদন গত বছর ৩১ মার্চ বিবেচনায় নিয়ে লটারির মাধ্যমে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর সংরিক্ষত পাঁচটি ফ্ল্যাট সাবেক প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী, হাইকোর্টের একজন বিচারপতি, জননিরাপত্তা বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খান ও রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান মিঞাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

গত বছর ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়েন। গত ২২ সেপ্টেম্বর সাবেক প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান তার নামে বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটটি রাজউককে ফিরিয়ে দিতে বলেন। চলতি বছর ৯ জানুয়ারি রাজউক কর্তৃপক্ষ তার ফ্ল্যাটের বরাদ্দ বাতিল করে।

গুলশানের রূপসা প্রকল্পে যারা ফ্ল্যাট পেয়েছেন তারা আওয়ামী লীগ সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে এগুলো পেয়েছেন। ফ্ল্যাটপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. জালাল আহমেদ, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হায়দার ভূঁইয়া, ফায়ার সার্ভিসের সাবেক পরিচালক সিদ্দিক মোহাম্মদ জুলফিকার রহমান, সাবেক সচিব ও সাবেক বিডার চেয়ারম্যান শেখ ইউসুফ হারুন, সাবেক আইজিপি ও এমপি নূর মোহাম্মদ, সাবেক সচিব মাহবুবুর রহমান সরকার, রাজউকের সাবেক সদস্য ইমরান কবির চৌধুরী ও নূরুল ইসলাম, সাবেক এমপি জহিরুল ইসলামের মেয়ে ইফফাত জাহান ঊর্মি, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. এম নাসির উদ্দিন মুন্সি, সাবেক সচিব এসএম কামরুল হাসান, সাবেক এমপি ইকবালুর রহিমের ভাই আশিকুর রহিম ও যুগ্ম সচিব মিনাক্ষী বর্মণ।

ফ্ল্যাটপ্রাপ্ত অন্য যাদের পরিচয় (পোর্টফোলিও) সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি তারা হলেন সাবিয়া আক্তার, ফাতেমা জেরিন, আলমগীর আলম, রিমিন ইসলাম প্রমি, মোছাম্মৎ নারগিস আখতার, মো. আবু বকর সিদ্দিক, হাসানুল আবেদীন হাসান, মো. কবির হোসেন ভুঞা, মোক্তার আলী গাজী, শফিকা ফারুকী, গোলাম রাব্বানী, মো. তৌহিদুর রহমান, এসএম কামরুল হাসান, দিলরুবা খানম, মো. মুনসুর আলী ম-ল, মো. ফারুক আজম, মো. হাসানুজ্জামান, সৈয়দ সারওয়ার মোর্শেদ আজম, জহিরুল কবির খান, আমেনা শারমিন, শেখ মো. নুরুল আমীন, অধ্যাপক ডা. নুর হোসেন ভুঞা, নিশাত নায়লা, মো. সালাহ উদ্দিন তালুকদার, আমিনুর রহমান চৌধুরী, হাফেজা আফতাব, নওশীন আরা পুতুল, নাহার খান, মো. মাহবুবুল হাসান, এমএইচ মোহাইমিনুল খান ও মো. আশরাফ আলী।