জাপানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে (আপার হাউস) নির্বাচনে গতকাল রবিবার বড় ধাক্কা খেল দেশটির ক্ষমতাসীন জোট। এ ফল প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার নেতৃত্বে বড় রকমের সংকট তৈরি করেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই পরিস্থিতি নীতিনির্ধারণে অচলাবস্থার শঙ্কা তৈরি করেছে এবং বাজেট ঘাটতি আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নির্বাচনে হেরে ইশিবার লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও জোটসঙ্গী কোমেইতো আপার হাউসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। তবে ইশিবা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আসন্ন শুল্ক চুক্তি আলোচনার কথা মাথায় রেখে তিনি এখনই পদত্যাগ করবেন না।
আজ সোমবার জাপানে সরকারি ছুটি থাকায় বাজার বন্ধ ছিল। কিন্তু ইয়েন ও নিকেই ফিউচারস সূচকে ওঠানামা দেখে বোঝা যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যে ফলাফল মূল্যায়ন করে ফেলেছেন। একদিকে ৩০ বছরের সরকারি বন্ডের সুদের হার পৌঁছেছে সর্বোচ্চ স্তরে, অন্যদিকে ইয়েনের মান পড়েছে ডলারের বিপরীতে।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা—চরম ডানপন্থী দল সানসেইতো-এর উত্থান। মাত্র ৩ বছর আগেও যাদের মাত্র একজন সদস্য ছিল, এবার তারা আপার হাউসে ১৪টি আসন দখল করে চমকে দিয়েছে রাজনৈতিক মহলকে।
‘জাপানিজ ফার্স্ট’ স্লোগানে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সানসেইতো দলটি করোনা মহামারির সময় ইউটিউবের মাধ্যমে পরিচিতি পায়, ছড়ায় নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব। দলটির নেতা সোহেই কামিয়া নির্বাচনের পর এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা বলি জাপান আগে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, সব বিদেশিকে তাড়াতে হবে।’
কামিয়া দাবি করেন, অভিবাসন ও বৈশ্বিকতাবিরোধী অবস্থানের কারণে তাদের ‘বিদ্বেষী’ বলা হলেও জনগণ এখন বুঝেছে গণমাধ্যমই ভুল ছিল।
দলটির ইউটিউব চ্যানেলের অনুসারীর সংখ্যা ৪ লাখ—এলডিপির তুলনায় তিন গুণ বেশি। তরুণ পুরুষদের মধ্যে দলটির সমর্থন বেশি হলেও এবার প্রচারে নারী প্রার্থীদের সামনে এনে ভাবমূর্তি পাল্টানোর চেষ্টা করেছে তারা। টোকিও থেকে জয়ী হয়েছেন গায়িকা সায়া, যিনি এক নামে পরিচিত।
নির্বাচনে জয়ের পর সানসেইতোসহ তিনটি প্রধান বিরোধী দলই ভোক্তা কর কমানো এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এতে জাপানের বিপুল সরকারি ঋণ আরও বাড়বে—যেটি ইতোমধ্যে জিডিপির প্রায় আড়াই গুণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনা এবং অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তার কারণে এলডিপি আপাতত নেতৃত্ব পরিবর্তন করবে না বলে মনে করছেন মিজুহো সিকিউরিটিজের প্রধান কৌশলবিদ শোকি ওমোরি। তবে শরৎকালীন পার্লামেন্ট অধিবেশন পর্যন্ত বড় কোনো সম্পূরক বাজেট আলোচনায় আসার সম্ভাবনা নেই।
যদি ইশিবা শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইয়েন ও শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে পারেন বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা।
সানসেইতো নেতা কামিয়া খোলাখুলি বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সাহসী রাজনৈতিক স্টাইল’ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর মতো জোট গড়ে তুলতে চান তিনি।
নির্বাচনের আগমুহূর্তে সরকার অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ‘অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা দমনে’ নতুন টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেয়। এলডিপি বলেছে, ‘অবৈধ বিদেশিদের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে।’
যদিও জাপানে এখন মাত্র ৩.৮ মিলিয়ন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন—যা মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের তুলনায় অনেক কম।
সব মিলিয়ে, জাপানের রাজনীতিতে সানসেইতো এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। দলের নেতা কামিয়ার ভাষায়, ‘এটা কেবল শুরু। আমরা সংগঠন গড়ে তুলছি, ৫০-৬০টি আসন পেলে আমাদের নীতিগুলো বাস্তবে রূপ পাবে।’
সূত্র: রয়টার্স