প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের ঘটনায় সচিবালয় ও উত্তরায় বিক্ষোভের পর চার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনায় গতকাল মঙ্গলবার রাত ৯টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার ওই বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে বিএনপির পক্ষ থেকে কেউ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, ‘বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে বলেছি যে, আমরা অবশ্যই সরকারের পাশে অতীতেও ছিলাম, এখনো আছি, সামনেও ইনশাআল্লাহ এই সরকারের পাশে থাকব।’
আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে গতকাল (সোমবার) থেকে আজকে (গতকাল মঙ্গলবার) যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) বলেছেন যে পরাজিত শক্তি, বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী শক্তির দোসররা, বিভিন্নভাবে চাচ্ছে এ পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার জন্য। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যাতে দেশে একটি অস্থিরতা তৈরি করা যায়, জনমনে আতঙ্ক ছড়ানো যায়, রিউমার ছড়ানো যায়। প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, যাতে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্য-সংহতি অটুট থাকে এবং রাজনৈতিকভাবে যাতে আগামীতে ফ্যাসিবাদী শক্তি কোনো সুযোগ নিতে না পারে। এজন্য যাতে সব ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ বা বিরোধ না থাকে।’
আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা বলেছি, রাজনৈতিক দল হিসেবে একেক দলের একেক রকম বক্তব্য থাকবে, সমালোচনাও থাকবে। সামনে যেহেতু নির্বাচন হবে, নির্বাচনের আগে এক দল অন্য দলের বিরুদ্ধে সমালোচনা করবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা একটা প্রশ্নে সবার মধ্যে একমত, সেটা হলো আওয়ামী ফ্যাসিবাদ যাতে আবার পুনর্বাসিত হতে না পারে, তারা যাতে দেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে না পারে, দেশের বিরুদ্ধে কোনোরকম তৎপরতা চালাতে না পারে, এ ব্যাপারে আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি।’
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এ আন্দোলনের পেছনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের হাত দেখতে পাওয়ার কথা বলেছে। ইসলামী আন্দোলনও যে একই ধারণা পোষণ করছে, সে কথা তুলে ধরে আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা একটা বিষয়ে বিশেষভাবে ইঙ্গিত করেছি, স্পষ্টভাবে, সেটা হলো বারবার আমরা দেখছি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বাংলাদেশ সচিবালয়, যেটা সেক্রেটারিয়েট, এই সেক্রেটারিয়েট বারবার আক্রান্ত হচ্ছে। এটা কেন হচ্ছে? অতীতে যেসব রাজনৈতিক সরকার ছিল, তখন তো এভাবে সচিবালয় আক্রান্ত হতো না। এখন এ সরকারের আমলে আমরা দেখলাম, বেশ কয়েকবার সচিবালয় অরক্ষিত। সচিবালয় এভাবে অরক্ষিত কেন থাকে? এখানে কি গোয়েন্দা ব্যর্থতা আছে? নাকি প্রশাসনিক কোনো ব্যর্থতা আছে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা আছে কি না, এ বিষয়টি গভীরভাবে সরকার যেন অনুসন্ধান করে দেখে, এ ব্যাপারে আমরা জোরালোভাবে কথা বলেছি।’
তিনি বলেন, ‘আরেকটা বিষয় হলো, আগামী জাতীয় নির্বাচন। আগামী জাতীয় নির্বাচনে তো আমরা যে রাজনৈতিক দলগুলো আছি, এসব রাজনৈতিক দলগুলোই আবার নির্বাচনে একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রচারণায়, সমালোচনায় এবং ক্যাম্পেইনে মাঠে নামবে। অতএব সরকারকে তখন শুধু আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী ষড়যন্ত্র মোকাবিলা নয়, বরং আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এজন্য আমরা বলছি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে হবে এবং প্রশাসনিকভাবে সরকার যেন মজবুত হয়, আরও কঠোর হয় এবং সবকিছুকে কঠিনভাবে দমন করে।’
প্রশাসনে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে এখনো ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ কেউ আছে কি না, খুঁজে দেখার তাগিদ দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের এ নেতা বলেন, ‘গোপালগঞ্জে আমরা যেটা দেখলাম, সেখানে টোটালি গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা তো আছেই। এ জাতীয় ঘটনা অন্যান্য জেলায়ও সামনে ঘটতে পারে। এজন্য আমরা বলেছি প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। সরকারকে আরও মজবুতভাবে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে, সঠিক ভূমিকা পালন করতে হবে।’
আগামীতে যাতে একটা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়, সে ব্যাপারে বৈঠকে ‘সবাই একমত হয়েছে’ মন্তব্য করে আতাউর রহমান বলেন, ‘সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির জন্য আমরা সবাই একযোগে কাজ করব এ ব্যাপারেও আমরা সবাই একমত হয়েছি।’
বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী; বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ; এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম মেম্বার অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন ও যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারকে শক্ত অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ : এদিকে বৈঠক শেষে রাত ১১টার পর সাংবাদিকদের কাছে বৈঠকে আলোচনার বিষয়গুলো তুলে ধরেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য দৃশ্যমান করার কথা বলেছেন বলে জানান আইন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোকে শুধু ঐক্যের কথা বলেননি, উনি বলেছেন আপনাদের মধ্যে ঐক্য আছে এটা আরেকটু দৃশ্যমান হলে ভালো হয়। আপনারা ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রশ্ন হোক, গঠনমূলক কোনো কর্মসূচির প্রসঙ্গে হোক, যদি একসঙ্গে থাকেন, এটা যদি মানুষ দেখে, মানুষের মধ্যে স্বস্তির ভাব আসবে, অনেক বেশি মানুষ খুশি হবে এটা দেখে।’
রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে দুটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ‘প্রথমটা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা যেন আরও শক্ত অবস্থান নিই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমাদের কিছুটা ঘাটতি আছে সে কথা বলেছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার দিকে আমাদের সুষ্ঠুভাবে অগ্রসর হওয়া উচিত।’
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য আছে বলে নেতারা প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছেন বলে জানান আইন উপদেষ্টা। এর উদাহরণ হিসেবে যখনই প্রধান উপদেষ্টা ডাক দেন, তখনই তারা এসে হাজির হন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে নিয়মিত গিয়ে কথা বলছেন সেসব বিষয় উল্লেখ করেছেন তারা। তাছাড়া ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য প্রশ্নে দলগুলোর মধ্যে কোনো হতাশা নেই বলেও উল্লেখ করেছেন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছে, ফ্যাসিবাদ প্রশ্নে তাদের মধ্যে কোনোরকম মতভিন্নতা, মতবিরোধ নেই। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন, রাজনীতির মাঠে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে কথা বলতে পারি। এর মানে এটা নয় যে, তারা আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তারা আমাদের রাজনৈতিক সহযোগী, রাজনৈতিক মাঠে মাঝেমধ্যে এরকম কিছু কথা বলা হবে। এর থেকে কোনোভাবে ধারণা করা উচিত নয়, ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরেছে।’