একসঙ্গে দুটির বেশি মিডিয়া ভোটকক্ষে প্রবেশে না

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নতুন নীতিমালা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এতে ভোটকক্ষে সরাসরি সম্প্রচার, গোপনকক্ষে ছবি তোলা, একাধিক মিডিয়ার উপস্থিতি ও সময়সীমা নিয়ে বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। নীতিমালায় বেশ কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আগেও বিতর্ক ছিল। এ নীতিমালাকে একতরফা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। তবে কমিশন জানিয়েছে, কারও কোনো বিষয়ে আপত্তি থাকলে আমাদের লিখিতভাবে জানাতে পারে। কমিশন পরবর্তী সময়ে বিবেচনা করবে।

গতকাল বুধবার ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের সই করা নীতিমালায় নির্বাচনী এলাকা ও ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের পালনীয় নির্দেশাবলিতে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন থেকে দেওয়া বৈধ কার্ডধারী সাংবাদিক সরাসরি ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন। ভোটকেন্দ্র্রে প্রবেশের পর প্রিসাইডিং অফিসারকে অবহিত করে ভোটগ্রহণ কার্যক্রমের তথ্য সংগ্রহ, ছবি তোলা এবং ভিডিও ধারণ করতে পারবেন, তবে কোনোক্রমেই গোপন কক্ষের ভেতরের ছবি ধারণ করতে পারবেন না।

ভোটকক্ষের ভেতর থেকে কোনোভাবেই সরাসরি সম্প্রচার করা যাবে না। সরাসরি সম্প্রচার করতে হলে ভোটকক্ষ থেকে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে তা করতে হবে। কোনোভাবেই ভোটগ্রহণ কার্যক্রমে বাধার সৃষ্টি করা যাবে না। একসঙ্গে দুটির বেশি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক কোনো ভোটকক্ষে প্রবেশ করতে পারবেন না এবং ১০ মিনিটের বেশি ভোটকক্ষে অবস্থান করা যাবে না। ভোটকক্ষে নির্বাচনী কর্মকর্তা, নির্বাচনী এজেন্ট বা ভোটারদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে পারবেন না সাংবাদিকরা।

এ ছাড়া সাংবাদিকরা গণনা কক্ষে ভোট গণনা দেখতে পারবেন, ছবি তুলতে পারবেন তবে সরাসরি সম্প্রচার করতে পারবেন না। ভোটকক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি প্রচার করতে পারবেন না। কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ কার্যক্রম ব্যাহত হয় এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। নির্বাচনী সংবাদ সংগ্রহের সময় প্রার্থী বা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে যেকোনো ধরনের প্রচার বা বিদ্বেষমূলক প্রচার থেকে বিরত থাকবেন এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তার জন্য নির্বাচনী আইন ও বিধিবিধান মেনে চলবেন।

ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকরা প্রিসাইডিং অফিসারের আইনানুগ নির্দেশনা মেনে চলবেন। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাজে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। কোনো ধরনের নির্বাচনী উপকরণ স্পর্শ বা অপসারণ করতে পারবেন না।

ইসির নতুন এ নীতিমালার কিছু বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ ধরনের নীতিমালা বাস্তবায়নের আগে ইসির উচিত ছিল সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা এবং সবার মতামত নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা তৈরি করা। তাদের দাবি, নির্বাচন কমিশন যেন অবিলম্বে এ নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করে।

নির্বাচন কমিশন বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (আরএফইডি) সভাপতি কাজী জেবেল বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই একতরফাভাবে এ নীতিমালা প্রকাশ করেছে। এখানে বেশ কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আগেও বিতর্ক ছিল। এটা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। এতে সাংবাদিকদের আইনগত সুরক্ষার কোনো বিধান রাখা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘নীতিমালায় কোথাও বলা হয়নি যে সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া যাবে না। বরং বলা হয়েছে, প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে অবহিত করে ছবি তুলতে বা তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। প্রশ্ন হলো, যদি ভোট কারচুপি হয়, তখন ওই কর্মকর্তাকে অবহিত করে কীভাবে সাংবাদিক তথ্য সংগ্রহ করবেন?’

একই সঙ্গে দুটির বেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিক ভোটকক্ষে প্রবেশ করতে পারবে না এবং ১০ মিনিটের বেশি সেখানে অবস্থান করতে পারবে না এ বিষয়ে তিনি আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘এই শর্ত গণমাধ্যমের স্বাধীন পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট বাধা তৈরি করবে। নীতিমালার ধারা-১১ অনুযায়ী, নির্দেশনা অমান্য করলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যদি কোনো ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সাংবাদিকের কাজে বাধা দেন, তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নীতিমালায় নেই।’

আরএফইডির সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমান বলেন, ‘দুজনের বেশি সাংবাদিক এক ভোটকক্ষে যেতে পারবেন না। কিন্তু কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম হচ্ছে, তখন কি পাঁচজন সাংবাদিক সেখানে প্রবেশ করতে পারবেন না? এ ধরনের বিধিনিষেধ এক ধরনের কালাকানুন মনে হয়। নির্বাচন স্বচ্ছ করতে হলে গণমাধ্যমকে অবাধে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ দিতে হবে।’

নীতিমালায় আরও বলা হয়, রাজধানীকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের কেন্দ্রীয় সাংবাদিক হিসেবে গণ্য করা হবে। এসব সাংবাদিকের পাস, গাড়ি ও মোটরসাইকেলের স্টিকার নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জনসংযোগ অধিশাখা থেকে দেওয়া হবে। স্থানীয় সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে জেলা বা উপজেলা থেকে প্রকাশিত পত্রিকা এবং জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন, অনলাইন, আইপিটিভির স্থানীয় প্রতিনিধি স্থানীয় সাংবাদিক হিসেবে বিবেচিত হবেন। স্থানীয় পর্যায়ের এসব সাংবাদিকের কার্ড, গাড়ি ও মোটরসাইকেলের স্টিকার সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার বা তার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দেবেন।

ইসির নির্দেশনাগুলো কোনো সাংবাদিক পালন না করলে কার্ড ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ পাস বাতিল করতে পারবেন। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ নীতিমালা নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন ও উপনির্বাচনের জন্য প্রযোজ্য হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স ফেমার সভাপতি মুনিরা খান বলেন, ‘নির্বাচনের সময় বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা থাকে। আমাদের দেশেও আছে। তবে কোনো নীতিমালার কারণে যদি তথ্য সংগ্রহ বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে গণমাধ্যম প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতে পারবে না। আমি মনে করি, গণমাধ্যমের উচিত নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের আপত্তিগুলো তুলে ধরা।’

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাংবাদিকদের যদি কোনো বিষয়ে আপত্তি থাকে, তারা লিখিতভাবে আবেদন করতে পারেন। আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখব। বিতর্ক থাকতেই পারে, সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। তবে আপত্তি থাকলে আমাদের জানাতে হবে, আমরা অবশ্যই দেখব।’