অঙ্গার ৬ লাশের বিপরীতে ১১ জনের ডিএনএ সংগ্রহ

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ৩২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে এখনো অনেকেই নিখোঁজ রয়েছে বলে স্বজনরা জানিয়েছেন। এই অবস্থায় স্বজনদের ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক এসিডের (ডিএনএ) নমুনা সংগ্রহের আহ্বান জানিয়েছে সরকার।

স্কুলটির ভেতর থেকে অঙ্গার ছয় লাশের বিপরীতে এখন পর্যন্ত ১১ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল বুধবার সকালে নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের এক পরিবারের বাবা ও মায়ের দুই জনের ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়। তবে তাদের নাম-ঠিকানা জানা যায়নি। এ বিষয়ে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসপি) শম্পা ইয়াসমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) থাকা ৬টি মরদেহ এবং মাংসপি- থেকে ১১টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর বিপরীতে সিআইডিতে এসে এখন পর্যন্ত ১১ জন দাবিদার তাদের রক্তের নমুনা দিয়ে গেছেন। এদের মধ্যে এক পরিবারের তিন ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

এদিকে এই ঘটনায় নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের মালিবাগে সিআইডি ভবনে ডিএনএ ম্যাচিংয়ের জন্য নমুনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে সরকার। গতকাল সরকারি তথ্যবিবরণী থেকে এই অনুরোধ জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, উত্তরায় বিমান দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের প্রকাশিত তালিকায় যাদের সন্তান বা স্বজনের নাম নেই, সেসব পরিবারের সদস্যদের মালিবাগে সিআইডি ভবনে ডিএনএ ম্যাচিংয়ের জন্য নমুনা প্রদানের অনুরোধ করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়বিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. মো. সায়েদুর রহমান গতকাল এ অনুরোধ  জানিয়েছেন।

এতে আরও বলা হয়, সিএমএইচের মর্গে রাখা ছয়টি মৃতদেহ এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে ইতিমধ্যে মৃতদেহগুলোর ডিএনএ অ্যানালাইসিসের (প্রোফাইলিং) জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা সিআইডির ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ প্রোফাইলিং করা হবে। নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের নমুনা পাওয়া গেলে সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই ডিএনএ ম্যাচিংয়ের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হবে।

নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের খোঁজে স্কুলে অভিযোগ করার অনুরোধ : বিমান দুর্ঘটনায় নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের সন্ধানে অভিভাবকদের স্কুলে এসে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল দুপুরে এ তথ্য জানান মাইলস্টোন গ্রুপের পরিচালক ও ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান রাসেল তালুকদার। তিনি বলেন, এইচএসসি পরীক্ষাথীদের কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে। তবে অন্য সব ক্লাসের কার্যক্রম কবে শুরু হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। বুধবার বিমান দুর্ঘটনার ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষ একটি কমিটি গঠন করেছে। কোনো অভিভাবক তার সন্তানকে খুঁজে না পেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫ নম্বর ভবনে অভিযোগ দায়ের অনুরোধ জানান তিনি। 

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ৮ রোগী, উন্নতির দিকে ২৩ জন : জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের গতকাল বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিচালক নাসির উদ্দীন বলেছেন, সিঙ্গাপুরের একজন বিশেষজ্ঞ নিয়ে আজ (গতকাল) আমরা বসেছি। বৈঠকে রোগীদের অবস্থা পর্যালোচনা করে ৩টি ভাগ করেছি। এখানে ক্রিটিক্যাল ক্যাটাগরিতে ৮ জন রোগী আছে। তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। তাদের অবস্থা ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিবর্তন হচ্ছে। তাদের বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। সিভিয়ার ক্যাটাগরিতে আছে ১৩ জন রোগী। ইন্টারমিডিয়েট ক্যাটাগরিতে আছে ২৩ রোগী। তাদের দ্রুত ভালোর দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সব মিলে মোট ৪৪ জন রোগী এখানে ভর্তি আছে।

পরিচালক বলেন, রোগীদের এই ৩ ক্যাটাগরি আমাদের ডায়নামিক প্রসেস। রোগীদের অবস্থাভেদে এসব ক্যাটাগরি পরিবর্তিত হতে পারে। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে এই ক্যাটাগরি করা হয়েছে। আমাদের এখানকার প্রত্যেক রোগী নিয়ে আজ আলোচনা করেছি। কারও অপারেশন লাগবে কি না, কার কি পরিমাণ ড্রেসিং লাগবে, ওষুধ পরিবর্তন হবে কি না; সব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সিঙ্গাপুরের প্রতিনিধি কতদিন থাকবে, এটা এখনো ঠিক হয়নি। তারা কতদিন থাকতে চায়। সেটা পরে জানাব।

সিঙ্গাপুরের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বেশ কিছু জায়গায় তিনি আমাদের সঙ্গে একমত। কিছু বিষয়ে তিনি আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন। আমেরিকাও আমাদের সহযোগিতা করতে চাচ্ছে। সবার পরামর্শ নেওয়া হবে। এই মুহূর্তে দগ্ধদের বিদেশ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। এখানে যে প্রটোকলে আছে সেটাই ফলো করব বলে জানান জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক নাসির উদ্দীন।

বার্নে কড়াকড়ি প্রবেশেও ছিল নিষেধাজ্ঞা :  বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহতদের দ্রুত নেওয়া হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। এরপর থেকেই সেখানে উপচেপড়া ভিড় লেগেই ছিল। কঠোর অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। গেটে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করে সেনাবাহিনী। তবে গতকাল সকালে বার্ন ইনস্টিটিউটের পুরো এলাকার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নেই উৎসুক জনতার ভিড়। শুধু বিমানে বিধ্বস্ত হতাহতদের স্বজন আর অন্য রোগীদের আত্মীয়-পরিজনদের, চিকিৎসাসংশ্লিষ্টদের দেখা গেছে।

সকালে ইনস্টিটিউটে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রবেশদ্বারে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন গেটে আনসার, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা কঠোর নজরদারিতে দায়িত্ব পালন করছেন। গণমাধ্যমকর্মীদেরও গতকাল নিচে কিংবা ভেতরে অবস্থান করতে দেওয়া হয়নি। অতিরিক্ত কোলাহল ও জনসমাগম এড়াতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

ভুল তথ্য না ছড়ানোর আহ্বান মাইলস্টোনের শিক্ষিকার : বিমানবাহিনীর এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভুল তথ্য না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন মাইলস্টোন স্কুলটির শিক্ষিকা পূর্ণিমা দাস। গতকাল সকালে ফেসবুকে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে পূর্ণিমা দাস এ অনুরোধ করেন। মাইলস্টোনের হায়দার আলী ভবনের এই শিক্ষিকা বিমান বিধ্বস্তের সময় নিজেও আগুনে আটকা পড়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘ভুল তথ্য ছড়াবেন না।’ মানুষের ইমোশন নিয়ে খেলবেন না। লাশ নিয়ে ফেসবুকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন সেই শিক্ষিকা।