আলোর মশাল হাতে স্বপ্নসন্ধানী

বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর পরিচয় বিবিধ। শিক্ষক, লেখক, সংগঠক, সম্পাদক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, পরিবেশ আন্দোলনের নেতা কিংবা আশ্চর্য এক বাগ্মী পুরুষ তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের সীমা পেরিয়ে ‘সায়ীদ স্যার’ তার বহুল পরিচিত নাম। সাতাশিতম জন্মদিনের তীরে স্মিতমুখে উপবিষ্ট সত্তাটিকে বিগত প্রায় আট দশক ধরে এ দেশের বর্তমান সবকটি প্রজন্মের মানুষ জেনেছে, চিনেছে নব নব অত্যুজ্জ্বল পরিচয়ে।

বহে জলবতী ধারা

জন্ম পার্ক সার্কাস কলকতায়, ১৯৩৯ সালের ২৫ জুলাই। এক স্কুল শিক্ষকের ভুলে আজীবন জন্ম সাল আর জন্মস্থান নিয়ে কেটেছে বিপত্তিতে। বয়স কমানোর অদ্ভুত রেওয়াজের শিকার হয়েছিলেন তিনিও! তার পৈতৃক নিবাস বাগেরহাট জেলার কচুয়া থানার অন্তর্গত কামারগাতি। তার বাবা মরহুম আযীমউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন স্বনামধন্য শিক্ষক। বাবার শিক্ষক হিসেবে অসামান্য সাফল্য ও জনপ্রিয়তাই যেন তার ভবিতব্য গড়ে দিয়েছিল শৈশবেই। বাবার কর্মসূত্রে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের নানা জায়গায়। বহতা নদীর মতো জীবনের বাঁকে বাঁকে জমেছে বিচিত্র পলিমাটির বৈভব। শিক্ষা জীবনে তিনি ১৯৫৫ সালে পাবনা জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করেন। উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ, বাগেরহাট (বর্তমান সরকারি পি.সি. কলেজ, বাগেরহাট) থেকে ১৯৫৭ সালে। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক বিএ (অনার্স) এবং ১৯৬১ সালে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। সাহিত্য, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’, ‘একুশে পদক’, ‘র‌্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার’ প্রভৃতি সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

নিষ্ফলা মাঠের কৃষক

শিক্ষক হিসেবে তার খ্যাতি কিংবদন্তিতুল্য। তিনি শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন ১৯৬১ সালে, মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে খ-কালীন প্রভাষক হিসেবে। পরবর্তী সময়ে তিনি কিছুকাল সিলেট মহিলা কলেজ, রাজশাহী কলেজ এবং ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজে (বর্তমানে ঢাকা বিজ্ঞান কলেজ) শিক্ষকতা করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলেজ ঢাকা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ জালালউদ্দিন আহমেদের আমন্ত্রণে সেখানে যোগদান করেন। ঢাকা কলেজেই তিনি তার শিক্ষকতা জীবনের স্বর্ণযুগ অতিবাহিত করেন। অধ্যাপক আবু সায়ীদ যখন ঢাকা কলেজে যোগ দেন তখন কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কথাসাহিত্যিক ও গদ্য লেখক শওকত ওসমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু ঢাকা কলেজে প্রাণবন্ত, সপ্রতিভ, উজ্জ্বল ছাত্রদের পড়ানোর তৃপ্তি, শিক্ষক-জীবনের অনির্বচনীয় আস্বাদ ছেড়ে যেতে চাননি। ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’ আমাদের শিক্ষাঙ্গনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ের অবিন্যস্ত প্রাথমিক দলিল বিশেষ।

ভালোবাসার সাম্পান কিংবা ষাটের কণ্ঠস্বর

...

দুচোখে চশমা নয়, ঝিলমিল স্বপ্ন

মলমের মতো মেখে দিলেন সায়ীদ ভাই

আমাদের দুই চোখে

আমাদের সবেধন নীলমণি

আমাদেরি কেউ কেউ খ্যাতি ও অখ্যাতির

সাগর পেরিয়ে গেছে,

কেউ কেউ ফিনফিনে স্মৃতি বিস্মৃতির

সুরভির ভাঁজ খুলে চলে

হৃদয় গহন দ্বারে

নিজেদের সেই কণ্ঠস্বর

হৃৎপি-ে আল্লারাখার আঙুলের কারুকাজ।

কৃতজ্ঞতা কোথায় যে রাখি!

-আসাদ চৌধুরী (অংশবিশেষ)

আসাদ চৌধুরীর এই কবিতা যেন ছয়ের দশকে ‘কণ্ঠস্বর’-কেন্দ্রিক সাহিত্য আন্দোলনের সার সংক্ষেপ। সায়ীদ স্যারের বড় কীর্তি কণ্ঠস্বরকে সঙ্গী করে এই সাহিত্য আন্দোলনের পুরোভাগে থাকা, নেতৃত্বে থাকা।

ষাটের দশকের সাহিত্যচর্চায় পুষ্টি সঞ্চার করেছে কণ্ঠস্বর এবং আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কেন্দ্রিক আড্ডা। তার সম্পাদনায় ‘কণ্ঠস্বর’ হয়ে উঠেছিল নতুন দিনের কবি-সাহিত্যিকদের পীঠস্থান। প্রতিষ্ঠানবিরোধী, অকপট, অকৃত্রিম সাহসের জমিন হয়ে উঠল কণ্ঠস্বর। ‘সমকাল’-এর পর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যপত্রিকা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন বিদ্বৎজনরা। ক্রমে ভিড় করছে পরবর্তী বাংলাদেশের নন্দিত লেখক কবিগণ। রফিক আজাদ, হুমায়ুন কবির, নির্মলেন্দু গুণ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, আবুল হাসান কে নেই সেখানে! নির্মলেন্দু গুণ বিরচিত ‘আমার কষ্ঠস্বর’ এই সাহিত্য আন্দোলনের জরুরি ইতিহাস ধারণ করে আছে। নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে প্রায় পরবর্তী এক যুগ সচল ছিল প্রকাশনাটি। ষাটের দশকের একজন প্রতিশ্রুতিময় কবি হিসেবেও পরিচিত তিনি, তবে ‘মৃত্যুময় চিরহরিৎ’ই তার একমাত্র কাব্যগ্রন্থ। তার কবিত্ব শক্তি বরং ফলবান করেছে তার গদ্যচর্চাকে। গদ্যে এবং বক্তৃতায় এমনই স্বচ্ছন্দ আর ভাষামাধুয্য মূলত তার কবিসত্তারই অনন্য উদ্ভাস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে বাংলা ভাষার শব্দভা-ারে যে অসামান্য প্লাবন বয়ে গেছে, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের লেখা ও কথায় সেসব অনিন্দ্য শব্দরাজির আশ্চর্য বিভা জাতিকে মুগ্ধ করে রেখেছে আজও।

১৯৭০-এর দশকে টিভি উপস্থাপক হিসেবে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। মজার বিষয় হলো, নিজেই যখন টেলিভিশনের নন্দিত উপস্থাপক তখনো তার বাসায় টিভি নেই! টেলিভিশনের বিনোদন ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় তিনি পথিকৃৎ ও অন্যতম সফল ব্যক্তিত্ব।

আলোকিত মানুষ চাই

১৯৭৮ সালে মাত্র ১০ জন মিলে বই পড়ার যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেখান থেকে আজ দেশ জুড়ে ছড়িয়েছে বই পড়ার আন্দোলন। পাঠচক্রের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখের কাছাকাছি। আশির দশকের মাঝামাঝিতে ৭ থেকে ৮টি বই নিয়ে শুরু হয়েছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রকাশনা। এখন বইয়ের সংখ্যা প্রায় আট শতাধিক। প্রায় ৪৭ বছর আগের একদিন, ১০ জন তরুণ ঠিক করেছিলেন, তারা পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের নক্সী কাঁথার মাঠ পড়বেন। তখন এ বইয়ের দাম ছিল সাড়ে ৩ টাকা। কিন্তু তারপরও কেনার সংগতি ছিল না তাদের। কিনে দিয়েছিলেন অন্য একজন। ‘নায়েম’-এর তৎকালীন ‘এডুকেশন এক্সটেনশন সেন্টার’-এর ছোট্ট মিলনায়তনে প্রতি শুক্রবার শুরু হয় বই পড়ার আসর। এরপর ইন্দিরা রোড হয়ে বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা। যৌথ পাঠের এই যে প্রয়োজন এবং এই পাঠের সামষ্টিক ফলাফল যে একটা জাতির মেধা ও মননকে শানিত করে তুলতে পারে তার সাক্ষ্য দেবে দেশ জুড়ে স্কুল-কলেজের লাখো শিক্ষার্থী। এরপর তো নিজেই নিজের দিগন্ত আঁকছে সবাই।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের সুষম সমবায় প্রস্ফুটিত হয়েছে তার অনন্য কীর্তি ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের’ সংগঠক সত্তায়। তার স্বপ্নের সার ফুটে আছে দুটি কথায়, ‘আলোকিত মানুষ চাই’ এবং ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’। তিনি স্বপ্ন দেখেন উচ্চায়ত, সম্পন্ন মানুষের। তাই ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সেøাগান ‘আলোকিত মানুষ চাই’। আলোকিত মানুষের রূপটি কেমন? তার অসংখ্য লেখা সেই জিজ্ঞাসারই উত্তর হয়ে আছে। যেমন ‘একজন মানুষকে আলোকিত হতে হলে তাকে সৌন্দর্যের কাছে যেতে হবে। আলোর কাছে যেতে হবে। কবিতা, গান, মেঘ, পূর্ণিমা, রাত্রির কাছে যেমন যেতে হবে, তেমনি যেতে হবে মানবসভ্যতার মহৎ বিস্ময়গুলোর সামনে। তাকে মানুষের দুঃখের কাছে যেতে হবে। সেই দুঃখের জবাব দেওয়ার প্রয়াসের মাঝখানে যেতে হবে। সংগ্রাম আর আত্মোৎসর্গ হবে তার করণীয়।’ (ভাঙো দুর্দশার চক্র, ২০১৭)

১৯৯৮ সালে থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রম আরম্ভ করে। নব্বইয়ের দশকে শুরুর সময় এ গাড়ির সংখ্যা ছিল মাত্র ৬টি। এখন সারা দেশে প্রায় ৭৬টি গাড়ি বই নিয়ে ঘুরে বেড়ায় শিক্ষার্থীদের দুয়ারে দুয়ারে। 

উজান স্রোতের সান্তিয়াগো কী হতে চেয়েছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ? শৈশবে নাকি গু-া সরদার হতে চেয়েছিলেন। ৩৬ না ৩৭ জনের বাহিনীও গড়েছিলেন পাড়ার ছেলেদের নিয়ে। এরপর এক দৈত্যকায় ট্রেন দেখে ট্রেন চালকও হতে চেয়েছিলেন। এমনি আরও কত স্বপ্ন! নেতৃত্বগুণ ছিল তার সহজাত, তাই স্কুলজীবনে গড়েছিলেন ‘ফিলোসফিক্যাল সোসাইটি’! বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে যুক্ত হলেন ‘নীরব সঙ্ঘ’ গড়ার কাজে। রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের সেই ঐতিহাসিক আয়োজনের নেপথ্যে ছিলেন অন্যতম সংগঠক হিসেবে। তার সংগঠক সত্তার নমুনা জাতি দেখেছে পরিবেশ আন্দোলনের দিনগুলোতে। ‘সুফলা ধরিত্রী’ গ্রন্থে সেই গল্পই বোনা আছে, যেমনি করে তার দার্শনিক সত্তার উদ্ভাস জাগরূক হয়ে আছে ‘বিস্রস্ত জার্নাল’-এ। প্রায় পঞ্চাশটি বই তার জীবন, স্বপ্ন আর যাপনের দিনলিপি যেন। বহে জলবতী ধারা, আমার বোকা শৈশব, নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, ভালোবাসার সাম্পান, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি বইয়ে ব্যক্তি, লেখক, চিন্তক ও কর্মী আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ হাঁটেন পাশাপাশি। তাকে ছুঁয়ে চিত্রিত হয়ে ওঠে বিগত প্রায় সাত দশকের বাংলাদেশের চিন্তাচর্চা, সাহিত্য আন্দোলন, সমাজ সংস্কার, শিক্ষাব্যবস্থার বিবর্তন, পরিবেশ আন্দোলন, বিনোদন দুনিয়া তথা রাজনীতির পরোক্ষ ইতিহাস।

বিভিন্ন পাঠচক্রে ‘স্যার’ অজস্রবার অসংখ্য তরুণকে পড়িয়েছেন ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী’। গল্পের বুড়ো সান্তিয়াগোর ন্যায় এই বিক্ষুব্ধ সময়ে, সমূহ ঝড়ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এদেশের অসংখ্য ম্যানোলিনকে স্বপ্নবাজ, জিজ্ঞাসু, উন্মুখ, উদ্যমী, সাহসী, বীক্ষাসম্পন্ন মানুষ গড়ার মিছিলে ডেকে চলেছেন নিরন্তর। সে সব গল্পে মুখর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আঙিনা, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কিংবা দেশ জুড়ে বিবিধ পাঠচক্রের আসর। বইয়ের দুনিয়া ছুঁয়ে এসব উন্মুখ পাঠক আজ ছড়িয়ে পড়ছে কেন্দ্র হতে তেপান্তরে। প্রিয় সায়ীদ স্যার আলো করে আছেন কেন্দ্রে উপস্থিত সুধীবৃন্দকে নতুন কোনো গল্প শোনাবেন বলে! আরও একটু সম্পন্ন, উচ্চায়ত মানুষ হয়ে ওঠার অভিযাত্রায় প্রতিটি অর্জন গুরুদক্ষিণা প্রিয় সান্তিয়াগোর নামে! 

হে নূতন দেখা দিক আরবার, জন্মের প্রথম শুভক্ষণ!

লেখক : সংস্কৃতিকর্মী