ইউএনএইচসিআর কার্যালয় আমাদের স্বার্থেই হয়েছে

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ‘ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) কার্যালয় আমাদের স্বার্থেই স্থাপিত হয়েছে। প্রয়োজনে ছয় মাসের নোটিস দিয়ে যেকোনো সময় এটি বন্ধ করা যাবে। তবে আমার মনে হয় না, এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘কার্যালয় স্থাপনের বিষয়টি দুই বছর পর পুনর্মূল্যায়ন করা যাবে।

প্রয়োজনে ছয় মাসের নোটিস দিয়ে এটি বন্ধ করা সম্ভব। তবে আমি মনে করি না, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। আমরা আমাদের স্বার্থরক্ষার জন্যই এটি করেছি। তাদের প্রস্তাব পাওয়ার পর তড়িঘড়ি করে চুক্তি সই করিনি, বরং দীর্ঘ সময় নিয়ে আমাদের স্বার্থ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করেছি। বিশেষজ্ঞদের প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে।’

চীন তাদের নদীতে যে বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তা বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলবে কি না, এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের নদীগুলোর উৎস আমাদের দেশে নয়। সেসব নদীতে অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে এবং হতে থাকবে। আমরা তা ঠেকাতে পারব না। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, এতে যেন আমাদের ক্ষতি না হয় এবং যদি ক্ষতি হয়, তা যেন ন্যূনতম থাকে। এ বিষয়ে চীনের রাষ্ট্রদূত আমার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তাদের হাইড্রো পাওয়ার প্রকল্পে বাঁধ দিয়ে পানি আটকানো হচ্ছে না। তারা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কয়েক ধাপে পানি ব্যবহার করছে, যাতে পানি প্রত্যাহার না হয়। এ বিষয়ে তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। তাই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আলোচনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যারা আলোচনা করছেন, তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করুন। মাঝপথে আমার মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’

বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্যকে প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ‘ঘর গোছানোর’ পরামর্শ দিয়েছেন। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ভিসা বন্ধের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো উদ্যোগ নিতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথমে নিজেদের ঘর গোছাতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি সেলস এজেন্সি। আপনারা যা তৈরি করবেন, আমরা তাই বিক্রি করতে পারব। মিথ্যা তথ্য বা ভুল পাসপোর্ট দেওয়া এখন আর সহজ নয়। আগে একজনের পাঁচটা পাসপোর্ট ইস্যু হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এখন এসব অনেক কঠিন হয়ে গেছে।’

রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে আহত ও অগ্নিদগ্ধদের চিকিৎসার জন্য ভারত ঢাকায় একটি বিশেষ মেডিকেল টিম পাঠিয়েছে। এটি কি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে শীতলতার ইঙ্গিত দেয়? এমন প্রশ্নে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চাই। পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই। এ অবস্থান অটুট রয়েছে। আমরা কখনোই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ চাই এমন কথা কেউ বলেনি, আমি বা আমার সরকারের কেউ এমন কথা বলেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক শিষ্টাচার পালন করেছি। বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার পর যেসব দেশ সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে, তাদের মধ্যে ভারতও রয়েছে। আমরা বার্ন ইউনিটের কাছ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছি এবং ভারতকে জানিয়েছি। তারা দুজন ডাক্তার ও দুজন নার্স পাঠিয়েছে। তারা তাদের সাধ্যমতো সেবা দেবে। দুই দেশের মানুষে মানুষে যোগাযোগ সবসময়ই ইতিবাচক।’ গত বুধবার রাতে অগ্নিদগ্ধদের চিকিৎসার জন্য তিন সদস্যের একটি ভারতীয় মেডিকেল টিম ঢাকায় এসেছে।

বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে এমন কিছু করিনি, যাতে সম্পর্ক নষ্ট হয়। প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। কারও ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আমরা তৈরি করিনি। আমাদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছি। ভারতের সঙ্গে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও কার্যকর কাজের পরিবেশের ভিত্তিতে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা।’

তিনি আরও বলেন, ‘মিথ্যা তথ্য আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা। এটি এখনো আগের মতো চলার চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু এখন এসব সহজে ধরা পড়ে যায়। এ কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের ঘর গোছাতে হবে। এ ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম যেন না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে ধীরে ধীরে আমরা পরিস্থিতি সংশোধন করতে পারব।’