ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত ৫ জনই শিক্ষার্থী

রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) আরও দুই শিক্ষার্থী মারা গেছে। এ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪ জনে। অপরদিকে, আগুনে বিকৃত হওয়া ডিএনএর মাধ্যমে পাঁচ লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তারা হলেন, ওকিয়া  ফেরদৌস নিধি, লামিয়া আক্তার সোনিয়া, আফসানা আক্তার প্রিয়া, রাইসা মনি ও মারিয়াম উম্মে আফিয়া। মোট ১১ জনের নমুনা সংগ্রহ করে তাদের পরিচেয় শনাক্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাব। গতকাল সিআইডি সদর দপ্তর  থেকে পাঠানো বার্তায় এই তথ্য জানানো হয়েছে।

সিআইডি জানায়, গত ২১ জুলাই উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের কারণে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২২ জুলাই সিআইডির ডিএনএ ল্যাবের সদস্যরা ঢাকা সিএমএইচে রক্ষিত অশনাক্ত মৃতদেহ ও দেহাংশ থেকে মোট ১১টি ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে। নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করে মোট পাঁচ নারীর ডিএনএ  প্রোফাইল পাওয়া যায়। সংগৃহীত নমুনা থেকে প্রস্তুতকৃত প্রোফাইল ও ঘটনার পর থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৫টি পরিবারের মোট ১১ জন সদস্যের প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে ৫টি মৃতদেহের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। এরমধ্যে একটি নমুনা থেকে একজন নারীর ডিএনএ  প্রোফাইল পাওয়া যায়। যা দাবিদার মো. ফারুক হোসেন ও সালমা আক্তার দম্পতির কন্যাসন্তান ওকিয়া ফেরদৌস নিধি প্রমাণিত হয়। ছয়টি নমুনা থেকে একজন নারীর ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়। যা দাবিদার মো. বাবুল ও মাজেদা দম্পতির কন্যাসন্তান লামিয়া আক্তার সোনিয়া প্রমাণিত হয়। দুটি নমুনা থেকে একজন নারীর ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়। যা দাবিদার মো. আব্বাস উদ্দিন ও  মোসা. মিনু আক্তার দম্পতির কন্যাসন্তান আফসানা আক্তার প্রিয়া প্রমাণিত হয়। একটি নমুনা থেকে একজন নারীর ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়। যা দাবিদার মো. শাহাবুল শেখ ও মিম দম্পতির কন্যাসন্তান রাইসা মনি প্রমাণিত হয়। একটি নমুনা থেকে একজন নারীর ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়। যা দাবিদার আব্দুল কাদির ও উম্মে তামিমা আক্তার দম্পতির কন্যাসন্তান মারিয়াম উম্মে আফিয়া প্রমাণিত হয়।

চারদিন লড়াই করে না ফেরার দেশে মাহিয়া : বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় দগ্ধ শিক্ষার্থী মাহিয়া তাসনিম (১৫) নামের আরও এক শিক্ষার্থী মারা গেছে। সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মারা যায় শিশুটি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান। তিনি বলেন, শিশুটির শরীরের ৫০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল।

মাহিয়ার মা আফরোজা বেগম বলেন, আমার মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। তিন মেয়ের মধ্যে মাহিয়া ছিল মেজো। পাঁচ বছর আগে ওর বাবা মারা যায়। বর্তমানে আমরা উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকি। তার অভিযোগ, ২১ জুলাই মাহিয়া সকাল ৭টায় বাসা  থেকে বের হয়। সকাল ৮টা থেকে ক্লাস শুরু হয়ে দুপুর একটায় তাদের ক্লাস শেষ হয়। মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ জোর করে বাচ্চাদের আটকে রাখে কোচিংয়ের জন্য। বাধ্য করা হয় কোচিং করতে। যদি দুপুর ১টায় তারা বের হতে পারত, তাহলে হয়তো তারা বেঁচে যেত। এমনভাবে তারা ক্লাসরুমকে খাঁচার মতো তৈরি করে রেখেছে চাইলেও বের হতে পারে না বাচ্চারা। আমার বাচ্চা তো মারা গেল এর দায় এখন কে নেবে।

ঝরে গেল আরও একটি ফুল : যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের পর চারদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে না ফেরার দেশে চলে গেল শিশু মাহতাব রহমান ভূঁইয়া (১২)। গতকাল দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে মারা যায় সে। মাহতাব রহমান ভূঁইয়া ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার শরীরের ৭০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। মাহতাবের পৈত্রিক নিবাস কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার রাজামেহার ইউনিয়নে। তার বাবার নাম মিনহাজুর রহমান ভূঁইয়া। এর আগে জাতীয় বার্নে আরও ১১ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। আন্তঃবাহনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৩ জনে।

আহতদের সহায়তায় বার্ন ইনস্টিটিউট ও সিএমএইচে সমন্বয় সেল গঠন : বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও তথ্যসহায়তার জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) সমন্বয় সেল গঠন করা হয়েছে। আইএসপিআর থেকে পাঠানো এক বার্তায় বিষয়টি জানানো হয়। বার্ন ইনস্টিটিউটে গঠিত সমন্বয় সেলটির অবস্থান ৮১১ নম্বর কক্ষে। যোগাযোগের জন্য হটলাইন নম্বর: ০১৭৬৯৯৯৩৫৫৮। সিএমএইচে গঠিত সেলে যোগাযোগ করা যাবে ০১৮১৫৯১২৬১৭ নম্বরে।

সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন আরও তিন চিকিৎসক : আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় সহায়তা দিতে সিঙ্গাপুর থেকে আরও তিন চিকিৎসক ঢাকায় এসেছেন। বুধবার রাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তাদের স্বাগত জানান। চিকিৎসকরা হলেন সিং হেলথের সিনিয়র ডিরেক্টর বিজয়া রাও, মিসেস পুন লাই কুয়ান এবং ম লিম ইউ হান জোভান। তাছাড়া বুধবার রাতে ভারত থেকেও কয়েকজন চিকিৎসক এসেছেন। এর আগে মঙ্গলবার রাতে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. চং সি জ্যাক ঢাকায় এসে  পৌঁছান। তিনি বুধবার জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা নিয়ে বৈঠক করেন। আরও কয়েকজন চিকিৎসক আসার কথা রয়েছে।

দগ্ধদের কারও রক্তের প্রয়োজন নেই : দগ্ধদের কারও রক্তের প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহম্মদ নাসির উদ্দিন। গতকাল রাতে দগ্ধদের সর্বশেষ তথ্য জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানিয়ে বলেন, দগ্ধদের কারও রক্তের প্রয়োজন  নেই। পাশাপাশি পর্যাপ্ত স্কিনের ব্যবস্থা থাকায় স্কিন ডোনেশনও  নেওয়া হচ্ছে না। অনেকে বিভিন্ন মাধ্যমে আর্থিক সহযোগিতা করার কথা জানতে চাইছে। তাদের উদ্দেশে বলছি, সরকার সব ধরনের আর্থিক সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় সবকিছু সরবরাহ করছে। আমাদের কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। আজ (গতকাল) আরও দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে আশঙ্কাজনক রোগী রয়েছেন ছয় জন। যে ১৩ জন খারাপ অবস্থায় ছিলেন তারা এখনো সে অবস্থাতেই আছে। তবে আমরা আশা করছি, তাদের উন্নতি হবে। তিনি আরও বলেন, ভালো খবর হচ্ছে গত দুদিনে ১৩ জনকে কেবিনে স্থানান্তর করতে পেরেছি, তাদের অনেককেই হয়তো আমরা আগামী দুই একদিনের মধ্যে বাসায় পাঠাতে পারব।