এজলাস থেকে কারাগারে সাবেক প্রধান বিচারপতি

সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হক গ্রেপ্তার হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে ধানম-ির বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলে। এরপর রাত সোয়া ৮টার দিকে তাকে কড়া নিরাপত্তায় নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ী এলাকায় আবদুল কাইয়ুম হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ছানাউল্লাহ তার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

গতকাল সকালে খায়রুল হককে গ্রেপ্তারের পর ডিবির যুগ্ম কমিশনার মো. নাসিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাকে (খায়রুল হক) ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও নারায়ণগঞ্জে তিনটি মামলা রয়েছে। যেকোনো একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে। এরপর বিকেলে তাকে যাত্রাবাড়ী থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আদালতে তোলার সময় খায়রুল হকের ওপর আক্রমণের চেষ্টা করেন কিছু আইনজীবী। অনেকে তাকে গালাগাল করেন এবং তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সেøাগান দেন। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম সাবেক কোনো প্রধান বিচারপতি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হয়ে গ্রেপ্তার ও কারাগারে গেলেন।

তবে, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা বিদেশে থাকাবস্থায় দুর্নীতির মামলায় ২০২১ সালের ৯ নভেম্বর অধস্তন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তিনি এখন বিদেশেই আছেন।

এদিকে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে গ্রেপ্তারের পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও আইনজীবীরা। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল গুলশানের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বড় পদে থেকে খায়রুল হক রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতের ইসলামী আমির শফিকুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, খায়রুল হক ইতিহাসের শিক্ষণীয় শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত। খায়রুল হকের গ্রেপ্তারের খবরে সুপ্রিম কোর্টে প্রতিক্রিয়া জানান জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। তারা সাবেক এ বিচারপতির দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি করেন। এদিকে বিধিবহির্ভূতভাবে প্লট নেওয়ার অভিযোগে খায়রুল হকের বিষয়ে নথি চেয়ে গতকাল গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

২০১০ সালের ১ অক্টোবর দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন খায়রুল হক। ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় সাত মাস বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালনকালে তার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ১৪ বছরের বেশি সময় আগে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দিয়েছিল। এ রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অবৈধ হয়ে যায়। রায়ের পর আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিলুপ্তির বিধান আনে। এরপর থেকে খায়রুল হককে নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্কের শুরু। তত্ত্বাবধায়কের পক্ষে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন পেশার মানুষরা তার বিরুদ্ধে রায় জালিয়াতির অভিযোগ আনেন। প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসরের পর ২০১৩ সালের ২৩ জুলাই আওয়ামী লীগ সরকার খায়রুল হককে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। এরপর একাধিকবার এ নিয়োগের মেয়াদ বাড়ানো হয়। আওয়ামীবিরোধী রাজনৈতিক দল ও আইনজীবীরা তাকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায় দেওয়ার পুরস্কার বলে অভিহিত করেন।

গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ১৩ আগস্ট তিনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করে অনেকটা আত্মগোপনে চলে যান। এরপর থেকে তাকে আইনের আওতায় আনতে সরব হন বিএনপিসহ আইনজীবীরা। তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে কর্মসূচি পালন করেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতারা। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি মামলা হয়েছে। দুর্নীতি ও রায় জালিয়াতির অভিযোগে ২৭ আগস্ট রাজধানীর শাহবাগ থানায় খায়রুল হকের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন। এর আগে ২৫ আগস্ট তার বিরুদ্ধে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় পরিবর্তন ও জালিয়াতির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় মামলা করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বারী ভূঁইয়া। এর আগে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে আব্দুল কাইয়ুম হত্যার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে গত ৬ জুলাই একটি মামলা হয়।

ফিরে দেখা তত্ত্বাবধায়ক বাতিলের রায় : ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণঅভ্যুত্থানে সামরিক শাসক এরশাদের পতন হয়। ১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে বিএনপি সরকার। এরপর নির্দলীয় এ পদ্ধতির সরকারের মাধ্যমে একাধিক নির্বাচন হয়। তবে বিচারপতি খায়রুল হকের এ রায়ের পর থেকে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা প্রশ্নে ১৯৯৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের তিনজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল দেয় হাইকোর্ট। ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনী ছিল সংবিধানসম্মত। পরে হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে আপিল করে রিটকারীপক্ষ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ১ মার্চ আপিল বিভাগে ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার শুনানি শুরু হয়। শুনানিতে রিট আবেদনকারী, রাষ্ট্রপক্ষ ছাড়াও অ্যামিকাস কিউরি (আদালতকে আইনি সহায়তাকারী) হিসেবে জ্যেষ্ঠ আটজন আইনজীবীর বক্তব্য শোনে সর্বোচ্চ আদালত। অ্যামিকাস কিউরিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পক্ষে মত দেন। ২০১১ সালের ১০ মে আপিল মঞ্জুর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অবৈধ ঘোষণা করেন তখনকার প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ। তবে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই ২০১১ সালের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলুপ্তিসহ ৫০টির বেশি সংশোধনী এনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী প্রস্তাব জাতীয় সংসদে পাস হয়। একই বছরের ৩ জুলাই এতে অনুমোদন দেন রাষ্ট্রপতি। ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। তত্ত্বাবধায়কের পক্ষে মত দেওয়া আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, আপিল বিভাগের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করলেও আরও দুই মেয়াদে এ পদ্ধতির মাধ্যমে মত দিয়েও পূর্ণাঙ্গ রায়ে তিনি সেটি উল্লেখ করেননি এবং এটি প্রতারণার শামিল।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ২৫ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনসংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) চেয়ে আপিল বিভাগে পাঁচজন আবেদনকারীর পক্ষে আবেদন করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। এতে ১৮টি যুক্তিতে সোয়া আটশ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুনর্বহাল চান আবেদনকারীরা। আবেদনকারীরা হলেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি এম. হাফিজ উদ্দিন খান, সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ এবং দুই তরুণ ভোটার জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান। পরে এ রিভিউতে বিএনপির পক্ষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতের পক্ষে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার পক্ষভুক্ত হন। রিভিউ আবেদনটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। গত ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এক রায়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলুপ্তিসংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দেয়। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আবারও ফিরে আসার পথ খোলে।

খায়রুল হকের বিচার চাইলেন আইনজীবীরা : সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বিচার চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্টে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘খায়রুল হকের কারণে বিগত একটি নির্বাচনও সুষ্ঠু হয়নি। শুধু তাই নয়, তার কারণে আয়নাঘর হয়েছে। হাজার মায়ের কোল খালি হয়েছে। লাখ লাখ অবৈধ মামলা হয়েছে। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান সম্পর্কে কটাক্ষ করেছেন। এই খায়রুল হক খালেদা জিয়াকে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। সরকারপ্রধানকে বলব, অনতিবিলম্বে এবং সবকিছুর আগে খায়রুল হকের বিচার এমনভাবে করবেন, যাতে জনতা বুঝতে পারে এই দেশে অবিচার করলে, বিচার বিভাগকে ধ্বংস করলে কী হয়।’

সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘খায়রুল হকের কারণে দেশের মানুষ বছরের পর বছর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। তার বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত, রায়, পদক্ষেপ বাংলাদেশের গণতন্ত্র বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রমাণিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে খায়রুল হক রায় দিয়ে বিচার বিভাগ ও সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।

যে মামলায় গ্রেপ্তার হলেন খায়রুল হক : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত বছর ১৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানাধীন এলাকায় আব্দুল কাইয়ুম আহাদের ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে গুলিবর্ষণ, ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত, টিয়ার সেল, সাউন্ড বোমাসহ নানা ধরনের অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করা হয়। এ সময় আব্দুল কাইয়ুমের মুখে ও বুকে গুলি লাগলে যাত্রাবাড়ী থানাধীন কাজলা পুলিশ বক্সের সামনে তিনি লুটিয়ে পড়েন। পরে যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হোসেন আব্দুল কাইয়ুম আহাদের দুই পায়ে ব্রাশফায়ার করেন। ভিকটিম আহাদকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় চলতি বছর ৬ জুলাই নিহতের বাবা মো. আলাউদ্দিন বাদী হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪৬৭ জনকে আসামি করে যাত্রাবাড়ী থানায় মামলাটি করেন। এ মামলায় ৪৪ নম্বর আসামি হলেন খায়রুল হক।