জীবিকার তাগিদে রিকশা চালান জুলাই যোদ্ধা রতন

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই গাজীপুরের শফিপুর এলাকায় আন্দোলনে ছিলেন বগুড়ার শফিকুল ইসলাম রতন। বিকেল ৪টার দিকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে পুলিশ। একটি গুলি তার ডান পা ভেদ করে বের হয়ে যায়। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর সারা দেশে যখন উল্লাস চলছিল তখন গুলিবিদ্ধ পা নিয়ে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন জুলাই যোদ্ধা রতন। পরে ওই পা কেটে ফেলতে হয়। এখন তিনি ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।

দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হলেও রতনের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। পরিবার নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। রতন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর বগুড়া শহরের জেলা জজ আদালতের সামনে কথা হয় তার সঙ্গে।

রতন বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ধাপগ্রামের মৃত ইলিয়াস উদ্দিন আকন্দের ছেলে। স্ত্রী, দুই মেয়ে নিয়ে রতনের সংসার। তার বড় মেয়ে সুস্মিতা আক্তার অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। ছোট মেয়ে মরিয়ম আক্তার সারিয়াকান্দি পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি পা হারিয়ে এখন উপার্জনে অক্ষম। এ কারণে রতনের মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধের পথে। তাদের পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে তিনি সরকারের কাছে মেয়ের জন্য একটি চাকরি চান।

রতন এখন বগুড়া শহরে আটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। একটি পা নেই বলে অনেকে তার রিকশায় উঠতে চান না। আবার অনেক সময় রিকশামালিক তাকে ভাড়াও দিতে চান না। তিনি জানান, ২০০৩ সালে যমুনা নদীর ভাঙনে নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে পড়াশোনা ছেড়ে পাড়ি জমান ঢাকায়। সেখানে তিনি অটোরিকশা চালাতেন। তার টাকায় চলত সংসার।

গত বছরের ১৬ জুলাই দুপুরে রংপুরে আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার পর সারা দেশে যখন আন্দোলন বেগবান হয়, সেদিন বিকেলে গাজীপুরের শফিপুর এলাকায় মিছিল বের হয়। পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। মাথায় গুলি লেগে একজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এ সময় অন্যদের সঙ্গে রতনও দৌড় দেন। তখন পুলিশ পেছন থেকে গুলি করলে একটি গুলি রতনের ডান পা ভেদ করে বের হয়ে যায়। রতন ছিটকে পড়ে যান। রাস্তার রেলিংয়ের একটি রড তার ডান হাতে ঢুকে যায়। ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হলে সারিয়াকান্দির গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। পরে গ্রামের বাড়িতে অসুস্থ অনুভব করলে তাকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পায়ে ইনফেকশন দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শে তার ডান পা কেটে ফেলা হয়।

রতন জানান, তিনি এ পর্যন্ত সরকারিভাবে এক লাখ টাকা অনুদান পেয়েছেন। আর ঢাকায় ব্র্যাক ব্যাংকের সহায়তায় একটি কৃত্রিম পা পেয়েছেন।

রতনের বড় মেয়ে সুস্মিতা আক্তার বলেন, ‘এক পা হারিয়ে আমার বাবা কোনো উপার্জন করতে পারছেন না। আমাদের পরিবার খুবই কষ্টে চলছে। পরিবারের ভরণপোষণে আমরা একান্তভাবে সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।’

রতন বলেন, ‘যেদিন এদেশের মানুষ তাদের প্রকৃত অধিকার ফিরে পাবে, ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত হবে, সাধারণ মানুষ দুবেলা ঠিকমতো খেতে পারবে সেদিনই আমার পা হারানোর বেদনা দূর হবে। আন্দোলন সার্থক হবে।’