নিম্নচাপের জোয়ারে ভাসল উপকূল

বৃষ্টিপাত ও জোয়ারে প্লাবিত হলো উপকূল। বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত জোয়ারের পানি উপকূল অতিক্রম করে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। একই সঙ্গে বৃষ্টি হওয়ায় স্থলভাগ অংশেও পানি বেড়ে গিয়ে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। দেশের সমগ্র উপকূলীয় এলাকায় বাড়তি উচ্চতার জোয়ার ছিল। তবে আজ রবিবার থেকে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়।

চট্টগ্রাম মহানগরীর মোহরা এলাকায় গতকাল দুপুরে প্রায় হাঁটু সমান পানি উঠে যায় রাস্তায়। হালদা নদী হয়ে অতিরিক্ত জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। প্রায় ঘণ্টাখানেক থাকা পানি ভাটার সময় ধীরে ধীরে নামতে থাকে। বঙ্গোপসাগরে কর্ণফুলীর মোহনা থেকে মোহরার দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। কালুরঘাটের উজানে কর্ণফুলীর উপনদী হালদা হয়ে মোহরায় গিয়ে অতিরিক্ত জোয়ারের পানি প্রবেশ বলে দিচ্ছে জোয়ারের বাড়তি উচ্চতার বিষয়টি। একইভাবে আনোয়ারা পারকি সমুদ্রসৈকত, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাটসহ পুরো এলাকায় ছিল বাড়তি জোয়ারের দাপট। অপরদিকে সন্দ্বীপ, হাতিয়াসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায়ও বাড়তি জোয়ারের দাপট ছিল বলে জানা যায়।

কিন্তু নিম্নচাপটি গত শুক্রবার সন্ধ্যায় স্থল নিম্নচাপ আকারে খুলনা ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবর্তী উপকূল দিয়ে অতিক্রম করার পর উপকূল জুড়ে বৃষ্টিপাত হচ্ছিল। কিন্তু গতকাল দুপুরে কেন বাড়তি উচ্চতার জোয়ার ছিল? নিম্নচাপটি উপকূল অতিক্রম করেছে প্রায় ১৮ ঘণ্টা আগে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিম্নচাপ উপকূলে উঠে যাওয়ার পরও পেছনের দিকে বাতাসের গতিবেগ রয়ে যায়। আর সেই বাতাসের সঙ্গে বাড়তি উচ্চতার জোয়ার থাকে। এ জন্যই আমরা উপকূলীয় এলাকায় স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে বাড়তি দুই থেকে তিন ফুট উচ্চতার জোয়ার হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলাম।

তিনি আরও বলেন, এ জন্যই উপকূলীয় এলাকায় গতকাল বাড়তি উচ্চতার জোয়ার দেখা দিয়েছে। তবে আজ রবিবার থেকে বাড়তি উচ্চতার জোয়ার কমে আসবে তবে বৃষ্টিপাত বাড়বে।

বৃষ্টিপাত কেন বাড়বে? এই প্রশ্নের জবাবে ড. ওমর ফারুক বলেন, ‘স্থল নিম্নচাপটি বিহার হয়ে গতকাল সন্ধ্যায় মধ্যপ্রদেশে অবস্থান করছিল। এর প্রভাবে পুরো দেশে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। আগামী দুদিন তা অব্যাহত থাকতে পারে।’

জোয়ারের ঢেউয়ের ধাক্কায় লন্ডভন্ড কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত : কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও অস্বাভাবিক জোয়ারের ঢেউয়ের আঘাতে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে ল-ভ- পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জোয়ারের ঢেউয়ের আঘাতে সৈকতের বালিয়াড়ি ভেঙে গেছে। সৈকতের পুলিশ বক্স, লকার ভেঙেছে অনেক স্থাপনার। ১২০ কিলোমিটার সৈকত তীরে উপড়ে পড়েছে কয়েক হাজার ঝাউগাছ। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও বেশ কিছু স্থাপনা। শনিবার সমুদ্র সৈকতের কক্সবাজারের কয়েকটি পয়েন্ট দেখা মেলে ভাঙনের তীব্রতা। ভেঙে সাগরগর্ভে তলিয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। এছাড়াও ভাঙনের উপক্রম হয়েছে একটি রেস্তোরাঁ। শৈবাল পয়েন্টে দুটি বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর ঝাউগাছ ভেঙে পড়ায় আশপাশের এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল দুপুর পর্যন্ত। পরে সেই গাছ কেটে সরিয়ে নেওয়া হলেও ঝুঁকিতে রয়েছে আরও কিছু খুঁটি। এ রকম ভাঙন অব্যাহত থাকলে কাছেই প্রায় সৈকত ঘেঁষে গড়ে তোলা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যালয়, জেলা প্রশাসনের তথ্য ও অভিযোগ কেন্দ্রসহ আরও কিছু স্থাপনা অচিরেই সাগরগর্ভে হারানোর হুমকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপ জুড়ে ভাঙন আতঙ্ক : নিম্নচাপ ও অম্যাবসার প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় কক্সবাজারের টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে সবধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে তিনদিন ধরে। ফলে সেন্টমার্টিন দ্বীপে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ১-৩ ফুট অধিক উচ্চতায় প্রবাহিত হওয়ায় দ্বীপের বিভিন্ন অংশের গাছপালা ভেঙে লোকালয়ে জোয়ারের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে শতাধিক ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। এতে করে আতঙ্কে রয়েছেন দ্বীপের সাড়ে ১১ হাজার বাসিন্দা। এ তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম।

ইউপির চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, অমাবস্যার জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ১-৩ ফুট অধিক উচ্চতায় প্রবাহিত হয়ে দ্বীপের বিভিন্ন অংশের গাছপালা ভেঙে লোকালয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। এতে করে শতাধিক বসতঘর প্লাবিত হয়েছে। জোয়ারের ঢেউয়ের আঘাতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। দ্বীপের চারদিকে জিও ব্যাগ বা ব্লক ফেলা না হলে মানচিত্র থেকে সেন্টমাটিন দ্বীপ হারিয়ে যাবে।

হাতিয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, ভাঙনের মুখে শতাধিক বাড়িঘর : হাতিয়া (নোয়াখালী)  প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার মেঘনা নদীতে অস্বাভাবিক জোয়ার হচ্ছে। প্রবল জোয়ারের কারণে  হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ, চর আতাউর, চরঘাসিয়া, সোনাদিয়া, সুখচর, নলচিরাসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে শতাধিক বাড়িঘর। গতকাল শনিবার বিকেল পর্যন্ত উপজেলার নিঝুম দ্বীপ, সোনাদিয়া, সুখচর, নলচিরা, চরকিং টাংকির ঘাট ও চেয়ারম্যানঘাট এলাকায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর সরিয়ে নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

নিম্নচাপের প্রভাবে কুয়াকাটা সৈকতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি : পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে পটুয়াখালীতে থেমে থেমে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। টানা ৩ দিনের বৃষ্টিতে জনজীবনে চরম ভোগান্তি নেমে এসেছে। নিম্নচাপ ও অমাবস্যার জোয়ায়ের প্রভাবে নদ-নদীর পানির উচ্চতা দুই থেকে তিন ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে প্রতিনিয়ত দুদফা প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চল। 

কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর বেশ উত্তাল রয়েছে। গতকাল দুদফা জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে ঢেউয়ের ঝাপটায় সৈকতের ঝাউবাগান, জাতীয় উদ্যান, সৈকতে প্রবেশের সড়কে নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। ভেঙে গেছে ঝাউবাগান ও জাতীয় উদ্যানের অসংখ্য গাছপালা। জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন হোসেনপাড়া এলাকার সড়কের প্রায় ৩০ মিটার ভেঙে ওই গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। ডিসি পার্ক সংলগ্ন সৈকত সড়কে নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। দীর্ঘ ২২ কিলোমিটার সৈকতের বিভিন্ন স্থানের অব্যাহত বালুক্ষয়ে মাটির স্তর বেরিয়ে এসেছে।

ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ করে তলিয়ে গেছে রাঙ্গাবালী উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রাম। ভেসে গেছে অসংখ্য মাছের ঘের ও পুকুর। তবে মৎস্যসহ অন্যান্য খাতে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটি এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর।