ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত, বিশেষ করে গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলোচনা ও বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানি গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য যৌথ আহ্বান জানিয়েছে, যখন ফ্রান্স ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, জার্মানি ও ইতালি এখনই এই স্বীকৃতির পক্ষে নয়। এই প্রতিবেদনে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান, যুদ্ধবিরতির আহ্বান, এবং ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানি গাজায় চলমান যুদ্ধ অবসানের জন্য একটি যৌথ বিবৃতি জারি করেছে। বিবৃতিতে তারা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং গাজার নাগরিকদের জন্য বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য, এবং মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। তারা ইসরায়েলের প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এ ছাড়া, গাজায় হামাসের ভূমিকা বন্ধ এবং তাদের নিরস্ত্রিকরণের ওপর জোর দিয়েছে তিন দেশ। তারা ভূখণ্ড দখল, বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেছে, এসব কার্যক্রম দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের পরিকল্পনায় ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার এবং হামাস নেতৃত্বের অপসারণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রথম জি-৭ দেশ হিসেবে ফ্রান্স ঘোষণা করেছে যে, তারা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেবে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখেঁাঁ একটি এক্স পোস্টে বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তির জন্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অপরিহার্য।’ তিনি গাজায় যুদ্ধবিরতি, জিম্মিদের মুক্তি এবং মানবিক সহায়তার পাশাপাশি হামাসকে নিরস্ত্র করা, গাজার পুনর্গঠন এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা মাখোঁর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। ফিলিস্তিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন আল-শেইখ বলেছেন, ‘এটি আন্তর্জাতিক আইন ও ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি ফ্রান্সের প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করে।’ হামাসও ফ্রান্সের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করে অন্য দেশগুলোকে এই পথ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাজ্যে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে। দেশটির ২২১ এমপি একটি যৌথ চিঠিতে সরকারকে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়, এই স্বীকৃতি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। তারা আগামী জাতিসংঘ সম্মেলনে এ বিষয়ে রূপরেখা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। যদিও যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের নীতি সমর্থন করে আসছে, তবুও তারা এখনো ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, অবিলম্বে স্বীকৃতির পরিবর্তে একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার আওতায় এটি করা উচিত, যা স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করবে। তিনি ফ্রান্স ও জার্মানির নেতাদের সঙ্গে জরুরি আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায় খুঁজছেন।
জার্মানি ও ইতালি এখনই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে নয়। জার্মান সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথে অগ্রগতি তাদের অগ্রাধিকার এবং নিকট ভবিষ্যতে স্বীকৃতির কোনো পরিকল্পনা নেই। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে তিনি থাকলেও প্রতিষ্ঠার আগে স্বীকৃতি দেওয়া সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে জটিলতা বাড়াতে পারে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী যোগ করেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি তখনই সম্ভব, যখন ফিলিস্তিনও ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে।
ফ্রান্সের সিদ্ধান্তের পর বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সৌদি আরব এটিকে ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের প্রতিফলন হিসেবে প্রশংসা করেছে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সিদ্ধান্তকে ‘সন্ত্রাসবাদকে পুরস্কৃত করা’ হিসেবে বর্ণনা করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ইসরায়েলের পাশে শান্তিপূর্ণভাবে থাকার জন্য নয়, বরং ইসরায়েলকে ধ্বংস করার উৎক্ষেপণস্থল হবে। যুক্তরাষ্ট্রও ফ্রান্সের এই পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বর্তমানে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য দেশের মধ্যে ১৪০টির বেশি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যার মধ্যে স্পেন ও আয়ারল্যান্ডের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশও রয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৫৯ হাজার ১০৬ জন নিহত হয়েছেন এবং গাজার বেশিরভাগ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) জানিয়েছে, গাজা শহরের প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে একজন অপুষ্টিতে ভুগছে, এবং এই সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। শতাধিক আন্তর্জাতিক ত্রাণ ও মানবাধিকার সংস্থা গাজায় ব্যাপক দুর্ভিক্ষের সতর্কতা জারি করেছে। ইসরায়েল অবশ্য দাবি করেছে, কোনো অবরোধ নেই, এবং অপুষ্টির জন্য হামাস দায়ী।
গাজায় যুদ্ধবিরতি ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফ্রান্স একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে উল্লেখযোগ্য সমর্থন থাকলেও সরকার এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। জার্মানি ও ইতালি স্বীকৃতির বিষয়ে আরও সময় চায়। গাজার মানবিক বিপর্যয় এবং চলমান সংঘাত এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত পদক্ষেপের গুরুত্ব তুলে ধরছে।