পাল্টা শুল্ক কমাতে কেনা হচ্ছে ২৫ বোয়িং!

ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্কের পরিমাণ হ্রাস করার বিষয়ে দরকষাকষি চলছে। সেই দরকষাকষির মধ্যেই এবার যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে কিছু উড়োজাহাজ এক-দুই বছরের মধ্যে সরবরাহ পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান। এছাড়া সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের (ইউএসটিআর) সঙ্গে তৃতীয় দফার আলোচনার জন্য আজ সোমবার বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

গতকাল রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনার সময় বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এসব কথা জানান। বাণিজ্য সচিব বলেন, ‘গত ২৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের অবস্থানপত্র পাঠানো হয়েছে। এরপর তাদের কাছে সভা করার সময় চাওয়া হয়েছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২৯ ও ৩০ জুলাই ওয়াশিংটনে ইউএসটিআর-এর অফিসে সরাসরি বৈঠকের সময় দেওয়া হয়েছে। এই বৈঠকে আলোচনার জন্য বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, আমি এবং একজন অতিরিক্ত সচিব আগামীকাল (আজ) সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছি।’

এর আগে বাণিজ্য উপদেষ্টার নেতৃত্বে ইউএসটিআর-এর সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় আলোচনা হয়েছিল ৯-১১ জুলাই। কিন্তু সে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। বরং কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বাংলাদেশ নন-ডিসক্লোজার চুক্তি করে আসায় বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। 

বাণিজ্য সচিব বলেন, ‘বোয়িংয়ে ব্যবসাটা সে দেশের সরকার করে না, বোয়িং কোম্পানি করে। আমরা ২৫টি বোয়িং কেনার ক্রয়াদেশ দিয়েছি, যদিও এর মধ্যে ১৪টির অর্ডার আগেই দেওয়া ছিল। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখানে শুধু আমরাই বোয়িং কিনছি না, একইভাবে ভারত ও ভিয়েতনাম ১০০টি করে এবং ইন্দোনেশিয়া ৫০টি বোয়িং কিনছে।’

পাল্টা শুল্কের তৃতীয় দফার আলোচনার আগে ইতিমধ্যেই সরকার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বাণিজ্য সচিব বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যখন তৃতীয় দফায় আমরা আলোচনায় বসব তখন দেশের সয়াবিন তেলের বেসরকারি আমদানিকারকরা বৈঠক করবেন ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে। তারা চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে সয়াবিন আমদানি করতে। আশা করছি তাদের মধ্যেও একটা সমঝোতা হবে।

তিনি বলেন, তুলা আমদানির বিষয়টি আগেই চূড়ান্ত হয়েছে। তিন বছর আগে আমরা ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি করতাম, সেটা এখন কমে গেছে। সেটা আবারও বাড়িয়ে আগের অবস্থায় নিতে পারলে সেখানেই ১ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি কমে আসবে।

এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির চুক্তি করেছে সরকার। ৫ বছর মেয়াদি এই চুক্তির আওতায় প্রতি বছর ৭ লাখ টন করে সরকারিভাবে গম আমদানি করা হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। রাশিয়া, ইউক্রেনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫-৩০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়তি দাম দিয়ে প্রতি মেট্রিক টন গম কিনতে হবে বাংলাদেশকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সবগুলো পদক্ষেপই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার জন্য। তৃতীয় দফার বৈঠকের আগে এই পদক্ষেপগুলো দৃশ্যমান করা হয়েছে যাতে করে বাংলাদেশ নেগোসিয়েশনে এগিয়ে থাকে।

গত ৩ এপ্রিল বিশে^র বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। সে সময় বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। এর আগে দেশটিতে পণ্য পাঠাতে গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হতো। পরে অবশ্য এই শুল্কের কার্যকারিতা ৩ মাস স্থগিত করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চালায় ইউএসটিআর। বিভিন্ন ধাপের আলোচনার পর গত ৮ জুলাই বাংলাদেশের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এই শুল্ক আগামী ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে বলেও জানানো হয়েছে। এই শুল্ক হার বহাল থাকলে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো পণ্য রপ্তানি করতে হলে ৫০ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করে তৈরি পোশাক। এ কারণে পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের এই শুল্ক মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে ইতিমধ্যেই কিছু কিছু অর্ডার বাতিল হতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দফার আলোচনার পরও শুল্কের পরিমাণ খুব একটা না কমায় এবং যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী কী বিষয়ে বাংলাদেশকে শর্ত দিয়েছে সেসব ব্যবসায়ীদের না জানানোয় তাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এই নেগোসিয়েশন আরও বেশি জোরালো করার জন্য সরকারকে লবিস্ট নিয়োগ দেওয়ার দাবিও তোলেন ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে লবিস্ট কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে না বলে সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাণিজ্য উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি সরকারি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে চূড়ান্ত আলোচনা হবে। সেখানে আমাদের (তৈরি পোশাক) সঙ্গে কোনো সভা নেই। বিষয়টি নিয়ে আমরা চিন্তিত। ইতিমধ্যে আমাদের ক্রেতারা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছেন। অভ্যন্তরীণভাবে কারখানা ব্যয় পরিচালনা করতে সমস্যা হচ্ছে। শ্রমিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি চলমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ সমস্যা বাড়ছে। কারখানার প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা রয়ে গেছে। এতে মাস শেষে শ্রমিকদের বেতন নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন কারখানা মালিকরা। অন্যদিকে ব্যাংক প্রয়োজনীয় টাকা দিতে পারছে না।

তিনি বলেন, শুল্ক বিষয়ে সমস্যা হচ্ছে, প্রতিযোগীদের সঙ্গে আমাদের প্রার্থক্য নিয়ে। প্রতিযোগীরা যদি আমাদের থেকে বেশি সুবিধা পায়, সে ক্ষেত্রে সমস্যা হবে। আমরা পিছিয়ে যাব। আর যদি কাছাকাছি বা সমপর্যায়ের শুল্কের আওতায় থাকি, সেক্ষেত্রে সমস্যা হবে না। বিষয়টি নিয়ে আমরা চিন্তিত। তার পরেও সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে, আমরাও আশাবাদী।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির অনেকগুলো জটিল বিষয় রয়েছে। সেসব শর্তের বিষয়ে সরকার যথেষ্টভাবে পরিহারের চেষ্টা করছে। সমঝোতার ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিষয় মানা সম্ভব নয় বলেও আমরা জেনেছি। তবে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সরকার দৃশ্যমান উদ্যোগ নিয়েছে। সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব নিয়ে আসতে পারে বলে জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।