জ্বালানি নিরাপত্তায় সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি

শিল্পের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এর ব্যবহারে দক্ষতা ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে সামগ্রিকভাবে অভ্যাসগত পরিবর্তন আনয়ন করতে হবে। গতকাল সোমবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় বক্তারা এ মন্তব্য করেন। ডিসিসিআই ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) যৌথ আয়োজনে সেমিনারটিতে সম্মানিত অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন।

অনুষ্ঠানে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, পেট্রোবাংলা, বিপিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিজিএমইএর নেতারা বক্তব্য রাখেন। এ সময় ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মান এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসহ আরও অনেকে অংশগ্রহণ করেন।

স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বার সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে আমাদের সামগ্রিকভাবে অভ্যাসগত পরিবর্তন আনয়ন করতে হবে। তিনি বলেন, সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষিত বিবেচনায় দেশের বেসরকারি খাত যথেষ্ট চাপের মধ্যে রয়েছে, সেই সঙ্গে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন মানসম্পন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকার কারণে আমরা পণ্য উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ছি, ফলে আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। শিল্প-কারাখানায় নিয়মিতভাবে ‘এনার্জি অডিট’ বাস্তবায়নের ওপর তিনি জোর দেন। এ ছাড়া তিনি শিল্পের খাতভিত্তিক গবেষণায় শিক্ষা খাতকে সম্পৃক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় ‘ইন্ডাস্ট্রি ম্যাপিংয়ের’ আহ্বান জানান।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, জ্বালানি দক্ষতা বিষয়ে ২০১৬ সালে একটি এনার্জি এফিশিয়েন্সি অ্যান্ড কন্সারভেশন মাস্টারপ্ল্যান এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ে ২০২৩ সালে ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান করা হলেও কোনো জ্বালানি দক্ষতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনা নেই, তাই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন বলেন, জ্বালানিভিত্তিক তথ্য প্রচার ও প্রাপ্তিতে একটা গ্যাপ রয়েছে, যার ফলে এ-বিষয়ক অনেক সরকারি সেবা সম্পর্কে দেশের বেসরকারি খাত অবগত নয়, এটি দূর করতে হবে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও নিউএজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহীম বলেন, দেশের বৃহৎ শিল্প-কারখানাগুলোয় জ্বালানি সরবরাহ থাকলেও, বিশেষ করে এসএমই খাতের উদ্যোক্তারা জ্বালানি স্বল্পতার কারণে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এ ছাড়া ঋণপ্রাপ্তি প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে তারা অর্থায়ন সমস্যায় মুখোমুখি হচ্ছেন, যার আশু সমাধান প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক হার হ্রাস করা গেলে শিল্প খাতে জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিচালন) মো. রফিকুল আলম বলেন, প্রতি কিউবিক এলএনজি আমদানিতে ৬৫-৭০ টাকা ব্যয় হলেও সরকার বিক্রি করছে ৩০ টাকায়, ফলে এখানে সরকারকে প্রচুর ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সব স্তরের ভোক্তাদের জ্বালানি ব্যবহারের জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব, সেই সঙ্গে এ-খাতে গবেষণা কার্যক্রম বাড়নোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বৃদ্ধির ওপর জোরারোপ করেন।

বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব (প্রশিক্ষণ শাখা) মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের মোট উৎপাদিত জ্বালানির ২৭ শতাংশ শিল্প খাতে ব্যবহৃত হয় এবং ২০৫০ সালে এ চাহিদা ৪০ শতাংশ উন্নীত হবে। তিনি বলেন, জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারে আমরা সাশ্রয়ী হলে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে শিল্প-কারখানাসহ জনগণকে জ্বালানি সেবা প্রদান সম্ভব হবে।

পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক (উৎপাদন ও বিপণন) মো. ইমাম উদ্দিন শেখ জানান, প্রতিদিন আমাদের গ্যাসের চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যদিও আমরা ২৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারছি, ঘাটতি রয়েছে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ প্রাপ্তির লক্ষ্যে শিল্পাঞ্চলগুলোয় কারখানা স্থাপনের জন্য উদ্যোক্তাদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

বাপেক্সের মহাব্যবস্থাপক (উৎপাদন বিভাগ) প্রকৌশলী মোহাম্মদ আহসানুল আমিন বলেন, শিল্পে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না, এটি অস্বীকারের উপায় নেই, শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিতের লক্ষ্যে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে ২০৩০ সালের মধ্যে সারা দেশে ১০০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, এলএনজি আমদানিতে বেসরকারি খাতে অধিকহারে সম্পৃক্তকরণে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।

বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মনসুর আহমেদ বলেন, প্রতিনিয়ত আমাদের প্রাকৃতি গ্যাস আহরণের হার হ্রাস পাচ্ছে, বিষয়টি উদ্বেগজনক, এমতাবস্থায় তিনি জ্বালানি আমদানি উৎসের বহুমুখীকরণের ওপর জোরারোপ করেন। একই সঙ্গে সবুজ অর্থায়নের ব্যাপ্তি বাড়ানোর আহ্বান জানান, তবে এলএনজিনির্ভরতা হ্রাস করতে হবে বলে মতপ্রকাশ করেন।

বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, নতুন শিল্প স্থাপনে জ্বালানির উচ্চমূল্য দেশের শিল্পায়ন বিকাশে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। তিনি জানান, বৃহত্তর গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং চলেছে, ফলে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া পণ্য উৎপাদনে সময়ক্ষেপণের কারণে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি।