মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম। গত রবিবার রাত ২টায় ১৪ বছর বয়সী দগ্ধ শিক্ষার্থী সাহিল ফারাবী আয়ান মারা যায়। বিষয়টি নিশ্চিত করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলে আয়ান। তার শরীরের ৪০ শতাংশ দগ্ধ ছিল। তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছিল।
সাহিল ফারাবি আয়ানের চাচা ডা. মোস্তফা কামাল আরেফিন জানান, আয়ান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি ভার্সনের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ালেখা করত। তার বাবার নাম মোহাম্মদ আলী মাসুদ। পরিবার নিয়ে মিরপুরের মধ্য মনিপুর এলাকায় থাকেন তারা। তিনি আরও বলেন, চোখের সামনে আয়ান মারা গেছে। কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারিনি। হাস্যোজ্জ্বল ছেলেটা সেদিনও সবার সঙ্গে কথা বলছে, স্কুলে গেছে আর আজ লাশ হয়ে বাড়ি ফিরল। আল্লাহ ওরে বেহেশত দান করুন। এ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন আয়ানের চাচা।
আয়ানের মৃত্যু নিয়ে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ৩৫ জন মারা গেল। তবে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ফের উল্লেখ করা হয় ৩৪ জনের মারা যাওয়ার খবর। গতকাল বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ইনস্টিটিউটে এখন ৩৩ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। যাদের মধ্যে ২৭ জনই শিশু। এদের মধ্যে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে তিনজন। যাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। একজন রয়েছে লাইফ সাপোর্টে। এ ছাড়া দগ্ধদের মধ্যে যাদের একটু কম গুরুতর অর্থাৎ সিভিয়ার ক্যাটাগরিতে রয়েছে নয়জন। বাকিরা অন্যান্য ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে। সোমবার (গতকাল) তিনজনকে ছুটি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে আবহাওয়া খারাপ থাকায় এবং তাদের আরেকটি ড্রেসিং দরকার মনে করায় ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। চলতি সপ্তাহে আরও বেশ কয়েকজনকে পর্যায়ক্রমে ছাড়পত্র দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিচালক আরও জানান, বিমান বিধ্বস্তে দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, চীন ও ভারত থেকে আসা চিকিৎসকরা পর্যায়ক্রমে নিজ নিজ দেশে চলে গেছেন এবং বাকিরা চলে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়ের সময় কাটছে সন্তানকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পাওয়ার প্রার্থনায়। গতকাল জাতীয় বার্নে সরেজমিন দেখা গেছে, হাসপাতালে চতুর্থচলায় আইসিইউর সামনের ওয়েটিং রুমে মাইলস্টোন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাভিদ নেওয়াজের (১৩) বাবা মিজানুর রহমান কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করছেন। রুমে অন্য পাশে মা তসবিহ পাঠ করছেন। আইসিইউর সামনে কথা হয় নাভিদের মামাতো ভাই আরিফ রহমান অনিকের সঙ্গে। তিনি জানান, নাভিদের শরীরের হাত-পিঠসহ শরীরের ৫২ শতাংশ পুড়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শ্বাসনালি। অবস্থা সংকটাপন্ন। এর মধ্যেও তার অপারেশন করতে হবে। শরীরে ইনফেকশন ছড়িয়ে যাচ্ছে।
আরিফ আরও বলেন, নাভিদ ও তার বোন একই ক্যাম্পাসে পড়ে। তার ছোট বোন অন্য ভবনে থাকায় সেদিন বেঁচে গেছে। ঘটনার সময়ে নাভিদের মা গেটের কাছে ছিলেন। নাভিদকে উদ্ধার করতে গিয়ে তিনি আহত হন। একই সময়ে মা ও ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা করাতে হয়েছে। নাভিদের মা সুস্থ হলেও বাসায় ফিরতে পারেননি। সন্তানের অপেক্ষায় এখন বার্ন ইনস্টিটিউটের আইসিইউর সামনেই কাটছে দিন রাত।
এরই মধ্যে আইসিইউ থেকে জানানো হয় নাভিদকে অপারেশন রুমে নেওয়া হবে। এতেই বাবা-মায়ের অস্থিরতা শুরু। নাভিদের মা বারবার আইসিইউর দরজার সামনে যাচ্ছেন সন্তানকে একনজর দেখবেন বলে। কিন্তু তাকে জানানো হয় ইতিমধ্যে তাকে অপারেশন রুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সন্তান দেখতে না পেয়ে আবারও ওয়েটিং রুমে ফিরে এসে প্রার্থনায় বসেছেন।
শুধু নাভিদ নয়, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থীদের স্বজনদের চিন্তায় নাওয়া-খাওয়া ভুলে গেছেন বাবা-মা। রাতদিন আইসিইউ ও ভর্তি ওয়ার্ডের দিকেই তাদের দৃষ্টি থাকে। কখন কী বার্তা আসে এ শঙ্কায় স্বজনরা।
এদিকে গতকাল দুপুরে বৃষ্টি উপেক্ষা করেও রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিধ্বস্ত হায়দার আলী ভবনটি দেখতে এসেছেন উৎসুক জনতা। তবে আগের দিনগুলো থেকে ভিড় অনেকটা কম ছিল। শিক্ষার্থীদের স্বজনরা আসছেন সন্তানদের হারানো স্মৃতি খুঁজতে। কলেজের প্রধান ফটক খুলে রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা কর্মীরা থাকলেও ভেতরে প্রবেশে গতকাল কাউকে বাধা দিচ্ছেন না। কলেজের স্টাফ, শিক্ষার্থী বা উৎসুক জনতা সবাই সাবলীলভাবেই ভেতরে প্রবেশ করছেন।
তদন্তে সহায়তায় আসতে পারে চীনের বিশেষজ্ঞ দল : যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনা তদন্তে সহায়তার জন্য চীনের একটি বিশেষজ্ঞ দল ঢাকায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। গতকাল দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিমানবাহিনীর জরুরি সমন্বয় কেন্দ্রের প্রধান সমন্বয়ক এয়ার কমোডর মো. মিজানুর রহমান এ তথ্য জানান।
মিজানুর রহমান বলেন, ঘটনার দিন বিমানবাহিনী উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণ করে এবং একইদিন উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্তকাজে সহায়তার জন্য চীনের একটি বিশেষজ্ঞ দল আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তদন্তে আন্তর্জাতিক সহায়তা দুর্ঘটনার মূল কারণ চিহ্নিত করতে সহায়ক হবে।
তিনি আরও বলেন, বিমানবাহিনীপ্রধান দুর্ঘটনার পরদিন এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের অনেক প্রশ্ন এবং সংশয়ের উত্তর দিয়েছেন। পরে তার দিকনির্দেশনায় বিমানবাহিনী দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে সম্পাদনের জন্য গত ২১ জুলাই একজন এয়ার কমোডর পদবির কর্মকর্তার নেতৃত্বে ‘জরুরি সহায়তা কেন্দ্র’ গঠন করা হয়। জরুরি সহায়তা কেন্দ্র থেকে আহতদের চিকিৎসা, আহতদের অবস্থান ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য, নিহতদের পরিচয় যাচাই ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, নিহতদের দাফন ও সৎকার কার্যক্রম সমন্বয়, হাসপাতালে রক্তদাতা প্রেরণ এবং সংগ্রহে সহায়তা এবং যেকোনো জরুরি তথ্য, পরামর্শ ইত্যাদি সহায়তায় কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া হতাহতদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে বিমানবাহিনী। যতদিন প্রয়োজন হয় ততদিন সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান বিমানবাহিনীর এ কর্মকর্তা।
প্রতিষ্ঠানটি খুলতে পারে আগামী রবিবার : উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ক্লাস শুরু আরও এক দফা পিছিয়েছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ছুটি বাড়িয়ে আগামী ২ আগস্ট (শনিবার) পর্যন্ত সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। গতকাল বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করে কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুল বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাদের সুরক্ষা ও মানসিক স্থিতি পুনঃস্থাপনই আমাদের মূল লক্ষ্য। তাই আবার ছুটি বাড়ানো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী রবিবার প্রতিষ্ঠনটি খুলতে পারে। তবে ছুটির মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রম চালু থাকবে বলে জানান তিনি।
নিহতদের সমাধিতে বিমানবাহিনীর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন : বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁনের নির্দেশে বিমানবাহিনীর প্রতিনিধিদল গতকাল সোমবার সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় নিহত গাজীপুরের কোমলমতি শিক্ষার্থী আব্দুল মুবাশ্বির মাকিন, সায়মা আক্তার, আফসানা আক্তার প্রিয়া, টাঙ্গাইলের মেহনাজ আফরিন হুমায়রা, তানভীর আহমেদ, রাঙ্গামাটির উক্যছাইং মারমা এরিকশন এবং ভোলার মাসুমা বেগমের (মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহায়ক) সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছে।
বিমানবাহিনীর প্রতিনিধিদল মরহুম ও মরহুমাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
এ ছাড়া, বিমানবাহিনীর পৃথক একটি প্রতিনিধিদল নিহত কোমলমতি শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ শামীম ও অভিভাবক লামিয়া আক্তার সোনিয়ার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং তাদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন।
প্রতিনিধিদলসমূহ শোকাহত পরিবারগুলোর যেকোনো প্রয়োজনে সর্বদা পাশে থাকার এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারগুলোকে যেকোনো প্রয়োজনে সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী সবসময়ই দেশের জনগণের পাশে রয়েছে এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।