আজও সই হচ্ছে না জুলাই সনদে

চলতি জুলাই মাসের মধ্যেই বহুল আলোচিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’-এ রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর নেওয়ার যে লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল, তা আর পূরণ হচ্ছে না। আজ বৃহস্পতিবার মাসের শেষ দিন হলেও খসড়া সনদে অন্তত আটটি মৌলিক সংস্কার নিয়ে মতৈক্যে না পৌঁছানোয় সইয়ের প্রক্রিয়া স্থগিত থাকছে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সই না হলেও আলোচনা থেমে যাচ্ছে না। বরং সংশোধিত একটি সমন্বিত খসড়া আজ দলগুলোর কাছে তুলে দেওয়া হবে। ওই খসড়ার ওপর মতামত ও আপত্তি জানাতে আজই চূড়ান্ত সুযোগ পাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। সকাল সাড়ে ১০টায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে নতুন করে আলোচনায় বসছে কমিশন ও অংশগ্রহণকারী দলগুলো।

গতকাল বুধবার দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় দফার ২২তম বৈঠকে কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘আশা করছি বৃহস্পতিবার আমরা একটি সমন্বিত ও গ্রহণযোগ্য খসড়া সনদ সব দলের কাছে তুলে দিতে পারব।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়গুলো নিয়ে মতামত থাকলে বৃহস্পতিবারের মধ্যেই জানাতে হবে। আমরা আজই আলোচনা শেষ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই।’

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের অক্টোবরের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। এসব কমিশনের দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে ফেব্রুয়ারিতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ছয়টি কমিশনের সুপারিশ দুই ভাগে ভাগ করে আশু বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন শুরু হলেও বাকি ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে পৃথক ও সম্মিলিতভাবে আলোচনা চালায় ঐকমত্য কমিশন।

এই দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে এখন পর্যন্ত ১২টি ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে—প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তন, নির্বাচন কমিশন গঠনের পদ্ধতি, হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা পুনঃনির্ধারণসহ একাধিক কাঠামোগত সংস্কার প্রস্তাব।

তবে ৮টি স্পর্শকাতর ইস্যুতে এখনো কোনো ঐক্যমত্য গড়ে ওঠেনি। এর মধ্যে রয়েছে—রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব, সংবিধিবদ্ধ চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পদ্ধতি, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, সংরক্ষিত নারী আসন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া।

বুধবারের বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব। বিকেল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চলা আলোচনা শেষে জানানো হয়, সাতটি আলোচ্য বিষয়ের একটিতেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সন্ধ্যায় কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক শেষে পুনরায় আলোচনায় বসেন।

বিএনপির প্রতিনিধি দলের নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংস্কার প্রস্তাবের অনেক অংশ অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। নির্বাচিত সরকার এলে বাকি প্রস্তাব বাস্তবায়নে সমস্যা হবে না।’

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ‘জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি না থাকলে এটি অর্থহীন হয়ে পড়বে।’ তিনি গণভোট ও রেফারেন্ডামের মাধ্যমে আইনি ভিত্তি দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘৩৬ জুলাইয়ের মধ্যে সনদ প্রকাশ না হলে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তিকে একত্র করে তা আদায় করা হবে।’

সবশেষে, কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ জানান, মৌলিক অধিকারের সম্প্রসারণে নীতিগত ঐকমত্য থাকলেও সংবিধানে তা কীভাবে যুক্ত হবে, তা নিয়ে দলগুলোর ভিন্নমত রয়েছে। তিনি আশাবাদী, আজকের মধ্যে নতুন খসড়ার আলোকে আলোচনা এগিয়ে যাবে।

তবে এখন পর্যন্ত যে বাস্তবতা, তাতে করে জুলাই মাসেই সনদে সই হচ্ছে না—এটা এখন নিশ্চিত। সংশয় থেকে যাচ্ছে পুরো প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও।