জুলাই অভ্যুত্থানের পর জাতীয় সরকার, নতুন সংবিধান ও বিভিন্ন প্রচারণা নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ফেসবুকের ভেরিফাইড পেজে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ছাত্রদের পক্ষ থেকে জাতীয় সরকারের কোনো প্রস্তাব তাদের দেওয়া হয়নি। তারা অন্য মাধ্যমে এটি পেয়েছিলেন। এই বক্তব্য সঠিক নয়।’
গতকালের স্ট্যাটাসে নাহিদ আরও কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট ২০২৪ রাতে প্রেস ব্রিফিংয়ে আমরা জানিয়েছিলাম, আমরা অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকার গঠন করতে চাই। এরপর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ভার্চুয়াল মিটিংয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে জাতীয় সরকার ও নতুন সংবিধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তারেক রহমান এতে সম্মত হননি এবং নাগরিক সমাজের সদস্যদের দিয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরামর্শ দেন। আমরা প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করি। ৭ আগস্ট ভোরে বিএনপি মহাসচিবের বাসায় অন্তর্বর্তী সরকার ও উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে আলোচনা হয়। উপদেষ্টা পরিষদের শপথের আগে তারেক রহমানের সঙ্গে আরেকটি মিটিংয়ে প্রস্তাবিত সদস্যদের নিয়ে পর্যালোচনা হয়।’
সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা দেওয়ার বিপক্ষে ছিলাম : নাহিদ ইসলাম লিখেছেন, ‘সেনাবাহিনী বা সেনাবাহিনী-সমর্থিত কোনো গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা না দেওয়ার ব্যাপারে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের স্পষ্ট অবস্থান ছিল।’ তিনি বলেন, ‘২ আগস্ট ২০২৪ রাতে জুলকারনাইন সায়েররা (প্রবাসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক) সামরিক বাহিনীর একাংশের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার জন্য আর্মি ক্যু চেয়েছিল। এজন্য ছাত্র সমন্বয়কদের ওপর চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়, যেন তারা ফেসবুকে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা করে এবং আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে। রিফাতদের লেখায় এ বিষয় উল্লেখ আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অবস্থান ছিল, এক দফার ঘোষণা জনগণের মাঝ থেকে মাঠে দিতে হবে। চাপ প্রয়োগকারীদের উদ্দেশ্য সন্দেহজনক। আমরা প্রথম থেকে স্পষ্ট ছিলাম, ক্ষমতা সেনাবাহিনী বা তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীর হাতে দেওয়া যাবে না। এতে আরেকটি এক-এগারোর ঝুঁকি তৈরি হবে, আওয়ামী লীগের ফিরে আসার সুযোগ হবে এবং প্রতিরক্ষা বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান হিসেবে সফল করতে হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এগোতে হবে। ৫ আগস্ট থেকে আমরা এই অবস্থান ব্যক্ত করে আসছি।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘৫ আগস্টের পর সায়ের গং আমাদের বিরুদ্ধে পাল্টা নেতৃত্ব তৈরির চেষ্টা করেছে। এজন্য তারা শিবির নেতা সাদিক কায়েমদের ব্যবহার করেছে। তারাও ব্যবহৃত হয়েছে। সায়ের গংয়ের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কল রেকর্ড ফাঁস, সার্ভাইলেন্স, চরিত্রহনন, অপপ্রচার, প্রোপাগান্ডা কোনো কিছুই বাকি নেই। বাংলাদেশে সিটিং মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচার ইতিহাসে বিরল। তবে মিথ্যার ওপর বেশিদিন টিকে থাকা যায় না। এরাও টিকবে না।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিবিরের ভূমিকা : নাহিদ লিখেছেন, “শিবির নেতা সাদিক কায়েম এক টকশোতে বলেছেন, ছাত্রশক্তির গঠনে শিবির যুক্ত ছিল এবং তাদের নির্দেশে আমরা কাজ করতাম। এটি মিথ্যাচার। ‘গুরুবার আড্ডা’ পাঠচক্রের একাংশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র অধিকার থেকে পদত্যাগকারী একাংশ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্টাডি সার্কেল মিলে ছাত্রশক্তি গঠিত হয়। নতুন ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠায় ‘গুরুবার আড্ডা’ পাঠচক্রে দীর্ঘদিন কাজ হয়েছে। আমরা ক্যাম্পাসে আট বছর রাজনীতি করেছি, ফলে সব সংগঠন ও নেতৃত্বকে চিনতাম এবং সবার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ঢাবি শিবিরের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল। কিন্তু যোগাযোগ বা সহযোগিতা মানে এ নয় যে তারা আমাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল।”
নাহিদ আরও বলেন, ‘সাদিক কায়েম বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক ছিলেন না। তবে ৫ আগস্ট থেকে তিনি এই পরিচয় ব্যবহার করেছেন। অভ্যুত্থানে শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে তাকে প্রেস ব্রিফিংয়ে বসার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু সাদিক কায়েমরা পরে প্রচার করেছেন, এই অভ্যুত্থানে ঢাবি শিবির নেতৃত্ব দিয়েছে, আমরা শুধু পোস্টার ছিলাম। অভ্যুত্থানে শিবিরের ভূমিকা কেউ অস্বীকার করেনি। তবে এটি শিবিরের একক নয়, তাদের নির্দেশনাও ছিল না। আমরা সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত নিতাম। কারা ক্ষমতার ভাগাভাগি বা গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করতে চায়, তা অন্যদিন বলব।’