ঘরে ঘরে জ্বর, হাসপাতালে ভিড়

কুমিল্লার মুরাদনগরে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে ভাইরাস জ্বর। সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। আক্রান্ত হচ্ছে ছোট-বড় সবাই। তবে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে ধীরে ধীরে অন্য সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছে। জ্বরের সঙ্গে শরীরে প্রচন্ড ব্যথাসহ দেখা দিচ্ছে নানা উপসর্গ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বেশি। প্রতিদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি ও বহির্বিভাগে ৬৫০-৭০০ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। আক্রান্ত হওয়া অসংখ্য রোগী শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের মেঝেতে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছে। আবার অনেকেই বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছে।

গতকাল সরেজমিনে মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগের সামনে দীর্ঘ লাইন। ভাইরাস জ¦রে আক্রান্ত অনেক শিশুকে চিকিৎসা দিতে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন অভিভাবকরা। পাশাপাশি বয়স্কদেরও নিয়ে এসেছে পরিবারের লোকজন। প্রতিদিন ১৭০-১৮০ জন শিশু রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছেন শিশুবিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন। জরুরি বিভাগে আসা শিশুদের পরিস্থিতি বুঝে ভর্তি দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে ১৮ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে কোনো শয্যা খালি নেই। পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। শয্যা না পেয়ে মেঝেতে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছে রোগীরা। রোগীর অধিকাংশই ভাইরাস জ্বর, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।

শিশু ওয়ার্ডে কর্তব্যরত নার্সরা জানান, ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে শিশু ওয়ার্ডে ১৮ শয্যার বিপরীতে ভর্তি হয়েছে ২৫ জন। এর মধ্যে বেশিরভাগ শিশুই জ্বর, সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।

মহিলা ও পুরুষ ওয়ার্ডে কর্তব্যরত নার্সরা জানান, মহিলা ওয়ার্ডে ১৭ শয্যার বিপরীতে ভর্তি হয়েছে ৩৮ জন এবং পুরুষ ওয়ার্ডে ১৫ শয্যার বিপরীতে ভর্তি হয়েছে ৩১ জন। ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি রোগী ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসা দিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।

১০ মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নিমাই কান্দি গ্রামের সাথী আক্তার বলেন, ‘তিন দিন ধরে বাচ্চার জ্বর-ঠান্ডা ও কাশি। এখন ডাক্তার দেখানোর জন্য অপেক্ষা করছি।’

শুশুন্ডা গ্রাম থেকে তিন বছরের শিশুসন্তান আজমাইনকে নিয়ে এসেছে তার বাবা সোহেল মিয়া। তিনি বলেন, ‘তিন দিন আগে জ্বর দেখা দিয়েছে। বাসায় বাচ্চাকে প্যারাসিটামল সিরাপ খাইয়েছি। জ্বর কমানোর জন্য ডোজও ব্যবহার করেছি। কিন্তু এখনো সুস্থ হয়নি। দিনে ভালো থাকলেও রাতে জ্বর আসে। সেজন্য ডাক্তার দেখাতে নিয়ে আসলাম।’

তিন বছরের ছেলে জুনায়েদকে নিয়ে দুদিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন পুড়াকান্দি গ্রামের নুরজাহান বেগম। কথা হলে তিনি জানান, তার ছেলে কিছুদিন ধরে জ্বর, বমি ও পাতলা পায়খানায় ভুগছিলেন। হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসক ভর্তি দিয়েছেন।

মহিলা ওয়ার্ডে ভর্তি মাধবপুর গ্রামের নাসিমা আক্তার (৩০) বলেন, ‘প্রথমে জ্বর আসে। পরে শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার শিশুবিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বর্তমানে আবহাওয়া পরিবর্তন ও বিভিন্ন কারণে ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি। হাসপাতালের বহির্বিভাগ এবং জরুরি বিভাগে আসা শিশুদের বেশিরভাগই জ্বর, ঠান্ডা, কাশি, নিউমোনিয়া এবং ডায়রিয়ায় ভুগছে।’

তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘গরমে শিশু ও বয়স্করা ঘেমে শরীর ভিজে যায়। এ সময় ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে। শিশুদের ধুলাবালি থেকে দূরে রাখতে হবে। ঘরের ভেতর যেন পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে শিশুদের দূরে রাখতে হবে। বাইরে বের হলে শিশু থেকে বয়স্ক সবাইকেই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে। পানির পাশাপাশি নরম ও তরল খাবার বেশি বেশি খাওয়াতে হবে।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা ডা. সিরাজুল ইসলাম মানিক বলেন, ‘এখন বর্ষাকাল এবং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকার কারণে এই ভাইরাস জ্বরের রোগীর সংখ্যা বেশি। প্রতিদিন জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগে শত শত রোগী আসছে। রোগীদের বেশিরভাগ ভাইরাসজনিত ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত। তাদের মধ্যে শিশু ও বয়স্ক রোগীর সংখ্যাই বেশি। জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের পরিস্থিতি বুঝে ভর্তি এবং বহির্বিভাগের রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেশি হলেও আমরা সর্বাত্মকভাবে রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’