অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নীতির অংশ হিসেবে আরও ৩৯ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। গতকাল শনিবার ৬টা ৪৫ মিনিটে একটি মার্কিন সামরিক বিমান (সি-১৭) ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে, যাতে এই ৩৯ জন ছিলেন।
ইমিগ্রেশন বিভাগ জানায়, প্রায় ৬০ ঘণ্টার ক্লান্তিকর যাত্রা শেষে ফেরত আসা এই ব্যক্তিরা হতাশা ও বিষণœতায় ভুগছিলেন। একজন ফেরত আসা ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা অপরাধী না, শুধু আশ্রয় চেয়েছিলাম। কিন্তু পুরো পথ আমাদের হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছে।’
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, এই ব্যক্তিরা পরিবার ও ভবিষ্যতের আশায় ৩০-৪০ লাখ টাকা ব্যয় করে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ঘুরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু তাদের আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। বিমানবন্দরে ফেরত আসাদের জন্য ব্র্যাক পরিবহন ও খাবারের ব্যবস্থা করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসন নীতি আরও কঠোর হওয়ায় এখন পর্যন্ত মোট ১১৮ জন বাংলাদেশিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ইইউ আদালতের রায় ইতালিতে বাংলাদেশিদের জন্য অশনি সংকেত :
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বোচ্চ আদালত (ইসিজে) অভিবাসন সংক্রান্ত এক মামলায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের পক্ষে রায় দিয়েছে। গত শুক্রবার লুক্সেমবার্গে দেওয়া এই রায়ে বলা হয়, কোনো দেশকে ‘নিরাপদ’ ঘোষণার ভিত্তিতে অভিবাসন আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা যাবে না। প্রতিটি আবেদন ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে এবং আবেদনকারীর নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এই রায়ের ফলে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ ইতালির ‘নিরাপদ দেশের তালিকা’ থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
মামলাটি শুরু হয় লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে প্রবেশ করা দুই বাংলাদেশিকে নিয়ে, যাদের ইতালি সরকার আলবেনিয়ায় পাঠায়। তারা আলবেনিয়া থেকে ইতালিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন, যা প্রাথমিকভাবে বাতিল হয়। পরে মানবাধিকার সংস্থার সহায়তায় তারা ইইউ আদালতে আপিল করেন। আদালতের রায়ে বলা হয়, ‘নিরাপদ দেশ’ ঘোষণার জন্য স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। জাতি, ধর্ম বা মতাদর্শের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী থাকলে কোনো দেশকে সামগ্রিকভাবে নিরাপদ বলা যাবে না। ইতালির ডানপন্থি সরকার এই রায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির দপ্তর বলেছে, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকারে হস্তক্ষেপ। অন্যদিকে, বামপন্থি দলগুলো এটিকে আইনি বিজয় হিসেবে দেখছে। ইতালি ও আলবেনিয়ার মধ্যে ২০২৩ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আলবেনিয়ার প্রসেসিং সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে, কিন্তু এই কেন্দ্রগুলোর ব্যয়বহুলতা (প্রতিজনের জন্য ১ লাখ ৫৩ হাজার ইউরো) এবং স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে সমালোচনা উঠেছে।
নিউজিল্যান্ডে পাসপোর্ট জালিয়াতির শাস্তি :
নিউজিল্যান্ডে ভুয়া বিয়ে ও পাসপোর্ট জালিয়াতির মাধ্যমে নাগরিকত্ব নেওয়ার অপরাধে বাংলাদেশি জাহাঙ্গীর আলমকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এটি দেশটির ইতিহাসে পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘আরএনজেড’ জানায়, জাহাঙ্গীর প্রায় ২৫ বছর ধরে জালিয়াতির মাধ্যমে নিউজিল্যান্ডে বসবাস করছিলেন। তার স্ত্রী তাজ পারভিন শিল্পীকে ১২ মাসের গৃহবন্দি দণ্ড দেওয়া হয়েছে, কারণ তিনি এই অপরাধ সম্পর্কে জানতেন। তবে তাদের ২১ বছর বয়সী সন্তানকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়, কারণ তিনি শিশু বয়সে দেশটিতে এসেছিলেন।
এই ঘটনাগুলো বিশ্বব্যাপী অভিবাসন নীতির ক্রমবর্ধমান কঠোরতার চিত্র তুলে ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেরত নীতি, ইতালির ‘নিরাপদ দেশ’ তালিকার বিতর্ক এবং নিউজিল্যান্ডে জালিয়াতির শাস্তি বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। তবে ইইউ আদালতের রায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য সুখবর হলেও, এটি ইতালির অভিবাসন নীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০২৬ সালে ইইউর নতুন অভিবাসন আইন কার্যকর হলে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রতি বিশ্বব্যাপী নীতির দ্বৈততা প্রকাশ করে একদিকে কঠোর শাস্তি ও ফেরত, অন্যদিকে আইনি সুরক্ষার প্রচেষ্টা। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ পথের অভাব এবং জালিয়াতির ঝুঁকি এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে রয়ে গেছে।