বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে প্রথমবারের মতো পা রাখতে যাওয়া বাংলাদেশী যুবাদের হৃদয়ে লড়াইয়ের বীজ বুনতে এসেছেন অভিজ্ঞ ডাচ কোচ সিগফ্রাইড আইকম্যান। জাপান, পাকিস্তান ও ওমানের মতো দলের কোচিং করানো ৬৪ বছর বয়সী কোচ চার মাসের চুক্তিতে নিয়েছেন বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২১ দলের দায়িত্ব। মূল কাজ শুরু করবেন সেপ্টেম্বর থেকে। তার আগে নেদারল্যান্ডস থেকে তাকে উড়িয়ে এনে চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা সেড়েছে বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন। ঢাকায় এসেছেন তিনদিন আগে।
রবিবার সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বাস্তবতা বিবেচনায় বড় কোন স্বপ্ন দেখাননি। তবে বড় মঞ্চে প্রবল প্রতিপক্ষের কাজকে কঠিণ করার মানসিকতায় বাংলাদেশকে গড়ে তোলাই হবে তার মূল লক্ষ্য।
এশিয়ায় দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে আইকম্যানের বাংলাদেশের হকি সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে আগে থেকেই। বিশেষ করে ওমানের কোচিং করানোর ফলে বাংলাদেশ বধের পরিকল্পনা আঁটতে হয়েছে একাধিকবার। সে কারণে বাংলাদেশের শক্তি ও দুর্বলতা ভালো্ই জানা। বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে খেলতে হবে অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে। কোচও বাস্তবতা জেনেই সব ম্যাচ জয়ের স্বপ্ন দেখাতে চান না, 'বাংলাদেশে আসার আগেই এখানকার হকির অবস্থা সম্পর্কে জানতাম। ২০০৯ সাল থেকে, যখন আমি প্রথম জাপান দলে যোগ দিই, তখন থেকেই আমি বিভিন্ন টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলা শুরু করি। আমি আমার দল নিয়ে অনেকবার বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলেছি এবং বাংলাদেশকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিশ্লেষণ করতে হয়েছে আমাকে। তাই বাংলাদেশের সামর্থ্য এবং বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জানি।'
আইকম্যান মনে করেন বাংলাদেশের যুবাদের জন্য বিশ্বকাপ নিজেদের প্রমাণের একটা বড় সুযোগ, 'ফেডারেশন তরুণদের ওপর বিনিয়োগ করতে চায়। ছেলেরা মূলত বিকেএসপিতে অনুশীলন করে, তাদের একটা ভিত্তি আছে। এখন আমাদের কাজ হলো সেই ভিত্তিটাকে স্থানীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা। পারফরম্যান্স লেভেল থেকে হাই পারফরম্যান্স পর্যায়ে পৌঁছানো। এটা ধাপে ধাপে করতে হবে। এর জন্য দরকার অভিজ্ঞতা, আর ভিন্নভাবে কাজ করার দৃষ্টিভঙ্গি।'
আপাতত ৪০ জনের একটি তালিকা নিয়ে কাজ করতে হবে আইকম্যানকে। যাদের নিয়ে কয়েকদিন আগে থেকেই কাজ শুরু করে দিয়েছেন আইকম্যানের দুই সহকারী মশিউর রহমান বিপ্লব ও আশিকউজ্জামান। আইকম্যানের চাওয়া এই যুবকদের ফিটনেস লেভেলটা বিশ্বকাপ মানের হোক। তাদের সঙ্গে দেখা করে কোচের মনে হয়েছে বাংলাদেশের ছেলেরা বড় মঞ্চে নিজেদের মেলে ধরতে মুখিয়ে আছে, 'খেলোয়াড়েরা দ্রুতগতির এবং দক্ষ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের মধ্যে পারফর্ম করার প্রবল ইচ্ছা আছে। তারা বিশ্বকাপে খেলতে চায়, এটাই তাদের স্বপ্ন। তাই তারা পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। নিজেদের বদলে ফেলতে হলে তাদের সময় চাই। মুখে বলা অনেক সহজ, তবে করে দেখানো কঠিন। তবে তাদের অন্তত ইচ্ছা আছে। আর ইচ্ছা থাকলে সেখান থেকে অনেক কিছু অর্জন করা সম্ভব। তাদের শারীরিক গঠন ভালো। কিন্তু দুর্বলতা হলো, তাদের স্ট্যামিনা নেই। তাদের মধ্যে শক্তি নেই। শুধু বড় ও শক্ত শরীর থাকলেই হবে না, শরীরের ভেতরে শক্তি থাকতে হবে। তাই আমাদের এটা নিয়ে কাজ করতে হবে।'
বাংলাদেশ হকির একটা সহযাত বৈশিষ্ঠ আগে থেকেই জানা আইকম্যানের। তারা আক্রমনাত্মক খেলতে পছন্দ করে। এটা যেমন ইতিবাচক, কোচের চোখে কখনও কখনও আত্মহুতি দেওয়ার মতো ব্যপার, 'বাংলাদেশ হকির দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা আক্রমণ করতে ভালোবাসে। কারণ তারা ভাবে, আমি যদি অনেক গোল করি, তাহলে জিতে যাব। কিন্তু তারা ভুলে যায়, যে রক্ষণও করতে হবে। ফলে তারা বল হারায়, প্রতিপক্ষ গোল করে। বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, চতুর্থ কোয়ার্টারে বাংলাদেশ অনেক গোল খেয়ে বসে। তখন তারা ভেঙে পড়ে, হতাশ হয়, এবং প্রচুর কার্ড পায়।'
বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন হকিই যুবাদের শেখাতে চান, যাতে বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের হারাতে অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স কিংবা কোরিয়ার কঠিন হয়, 'যদি আপনি লড়াই করেন, যদি প্রতিপক্ষ দলকে কঠিনতার মুখে ফেলতে পারেন সেটাই হবে বড় পাওয়া। তারা যত ভালোই হোক। জিততে হলে তাদের পারফর্ম করতেই হবে। এই মানসিকতাটাই আমি বাংলাদেশে নিয়ে আসতে চাই। যদি আমরা এটা করতে পারি, তাহলে আমাদের একটা সুযোগ থাকবে।'
বিশ্বকাপ নিশ্চিত হয়েছিল গত ডিসেম্বরে। এরপর সাত মাস কেটে গেছে। একটু দেরিতেই হুশ হয়েছে বাংলাদেশের। বড় মঞ্চের জন্য তাই তারা উড়িয়ে এনেছে বড় কোচ। যিনি বড় স্বপ্ন নয়, বরং যুবাদের হৃদয়ে বুনতে চান লড়াইয়ের বীজ।