বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের জীবনাবসন ঘটল। দেশের হকি ও ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম কিংবদন্তি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত আব্দুস সাদেক আর নেই।
আজ সকালে রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত কন্টিনেন্টাল হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বঋর।
তার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই দেশের বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠন, সাবেক খেলোয়াড়, কোচ ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বরা গভীর শোক প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে ঘিরে স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধার ঢল নামে।
আব্দুস সাদেক ছিলেন এমন এক বিরল ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব, যিনি একসঙ্গে ফুটবল ও হকি—দুই ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতা ও সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। খেলোয়াড় হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি তিনি অধিনায়ক, কোচ, সংগঠক ও প্রশাসক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্রীড়া জীবন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি স্বাধীন বাংলাদেশের হয়েও তিনি জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন যখন পুনর্গঠনের পথে হাঁটছিল, তখন আব্দুস সাদেক ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম পথপ্রদর্শক ক্রীড়াবিদদের একজন। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত আবাহনী ক্রীড়া চক্র ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে তিনি ইতিহাসে জায়গা করে নেন।
১৯৭৮ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে তিনি বাংলাদেশের হকি দলের নেতৃত্ব দেন। সেই আসরকে দেশের আন্তর্জাতিক হকির প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনে নিজেদের পরিচয় জানান দিতে শুরু করে।
স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন ঘরোয়া প্রতিযোগিতা শুরু করে এবং ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের স্বীকৃতি লাভ করে। এরপর ১৯৭৭ সালে জুনিয়র বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ এবং ১৯৭৮ সালের এশিয়ান গেমসে অভিষেক বাংলাদেশের হকির ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে, যার নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুস সাদেক।
সত্তর ও আশির দশকে দেশের হকিতে প্রতাপ শঙ্কর হাজরা, ইব্রাহীম সাবের, এহতেশাম সুলতান, খাজা ড্যানিয়েল এবং জুম্মন লুসাইয়ের মতো অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় ছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সীমিত সুযোগের কারণে অনেকেরই অধিনায়ক হওয়ার সুযোগ হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে আব্দুস সাদেকের নেতৃত্বের অর্জন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
খেলোয়াড়ি জীবনের পর তিনি ক্রীড়া সংগঠক ও প্রশাসক হিসেবেও সক্রিয় ছিলেন। তরুণ খেলোয়াড়দের গড়ে তোলা, ক্রীড়া উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া এবং বিভিন্ন উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়া ছিল তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর আচরণ, শৃঙ্খলা ও ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা তাঁকে সহকর্মীদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করেছিল।
আব্দুস সাদেকের মৃত্যুতে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন হারাল একজন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্বকে। ক্রীড়াঙ্গনের সবাই তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে আব্দুস সাদেক চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।