৩৬ দিনের জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণ করে শোক, নানা বর্ণিল ও ব্যতিক্রম আয়োজনে দেশ জুড়ে পালিত হলো ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার পতনের এই দিনটিতে গতকাল মঙ্গলবার জুলাই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, আলোচনা সভা, র্যালি ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত গণসমাবেশে সব পক্ষের উপস্থিতিতে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ জাতির সামনে উপস্থাপন করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গণঅভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। অনুষ্ঠানে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। এর আগে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় ‘জুলাই পুনর্জাগরণ’ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার পলায়নের এক বছর পূর্তিতে আকাশে প্রতীকী হেলিকপ্টার, গ্যাসবেলুন উড়িয়ে উদযাপন করা হয়। বেলা ২টা ২৫ মিনিটে শেখ হাসিনার পলায়নের ক্ষণকে স্মরণীয় করে রাখতে এ ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও জাতীয় সংসদের আশপাশ এলাকায়।
২০২৪-এর জুলাইতে ৩৬ দিনের গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। অবসান ঘটে স্বৈরাচারী শাসনের। গণআন্দোলন দমাতে ১ হাজারের বেশি মানুষ হত্যা ও ২০ হাজারের বেশি মানুষকে গুলি ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। এর ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার ৫ আগস্টকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। দিবসটি উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার ছিল সরকারি ছুটির দিন। এ উপলক্ষে সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে।
দিবসে ডাকটিকিট অবমুক্ত :
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে একটি স্মারক ডাকটিকিট, উদ্বোধনী খাম ও সিলমোহর অবমুক্ত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ডাকটিকিট, উদ্বোধনী খাম ও সিলমোহর অবমুক্ত করেন তিনি। এ সময় শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম, শিল্প ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব আবদুন নাসের খান উপস্থিত ছিলেন।
ঢাবির সাদা দলের র্যালি :
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনের অবসান এবং স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পলায়নের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে র্যালি করেছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’। গতকাল দুপুর পৌনে একটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে র্যালিটি শুরু করেন সংগঠনের নেতারা। র্যালিটি রাজু ভাস্কর্য ঘুরে ভিসি চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। এর আগে, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে বিমান বিধ্বস্তে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুস সালামের সভাপতিত্বে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন ছিদ্দিকুর রহমান, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবিএম ওবাইদুল ইসলাম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান, সাদা দলের যুগ্মআহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার, ঢাবির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী প্রমুখ।
বায়তুল মোকাররমে বিশেষ দোয়া :
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে শহীদ ছাত্র-জনতার রুহের মাগফিরাত ও আহতদের সুস্থতা কামনা করে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে কোরআন খতম ও বিশেষ দোয়া-মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সকাল ১১টায় কোরআন খতম এবং বাদ জোহর বিশেষ দোয়া-মোনাজাত পরিচালনা করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মো. মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আবদুস সালাম খান। এ ছাড়া ফাউন্ডেশনের সচিব, বিভিন্ন বিভাগের পরিচালক ও উপপরিচালক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ মুসল্লিরা উপস্থিত ছিলেন।
ইসলামী আন্দোলনের গণসমাবেশ :
স্বৈরাচার পতনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে গণসমাবেশ করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। গতকাল বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে এ সমাবেশের আয়োজন করে ইসলামী আন্দোলনের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দলের আমির ও চরমোনাইর পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। তিনি বলেন, জুলাইয়ে রক্ত ও জীবন উৎসর্গের সার্থকতা নিশ্চিত করতে বাংলার জমিন থেকে চাঁদাবাজ, খুনি ও তাঁবেদারদের চিরতরে উৎখাত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট, খুনি, গুমকারী ও পাচারকারী পালিয়ে যায়। তাদের উৎখাতে যারা জীবন দিয়েছে, আহত হয়েছে, চক্ষু হারিয়েছে বা পঙ্গুত্ব বরণ করেছে তাদের ত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মাওলানা ইমতেয়াজ আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ, যুগ্মমহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ প্রমুখ।
মানবাধিকার কমিশনে আলোচনা সভা :
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সভাকক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের সচিব সেবাস্টিন রেমা। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) বেগম মেহেরুন্নেসা এবং পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) কাজী আরফান আশিক। এ সময় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মার মাগফিরাত ও আহতদের সুস্থতা কামনা করা হয়।
ছাত্রশিবিরের র্যালি :
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে ‘জুলাই জাগরণ নবউদ্যমে বিনির্মাণ’ শীর্ষক র্যালি করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। সংগঠনের ঢাকা মহানগর শাখার উদ্যোগে র্যালিটি গতকাল সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু হয়ে শাহবাগে গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। ছাত্রশিবিরের ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) সভাপতি হেলাল উদ্দিন ও মহানগর পূর্বের সভাপতি আসিফ আব্দুল্লাহর সঞ্চালনায় সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম। সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ, প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, আন্তর্জাতিক সম্পাদক মু’তাসিম বিল্লাহ শাহেদী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এস. এম. ফরহাদ প্রমুখ।
এদিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উদযাপন করেছে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক)। দিবসটি উপলক্ষে সকালে জাগৃকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শাহবাগে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে’ পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বিকেলে সেগুনবাগিচায় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে এক আলোচনা সভা ও স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রহমান তরফদার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাগৃকের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উদযাপন উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে সেতু বিভাগ ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেতু বিভাগের সচিব এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ।