গণআন্দোলন দমনে হাজারের বেশি মানুষ হত্যা ও ২০ হাজারের বেশি মানুষকে নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে। দেশ পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের যে কয়েকটি প্রতিশ্রুতি অগ্রাধিকারের তালিকায় ছিল, তার একটি এসব হত্যাকা-, নির্যাতন ও আন্দোলনকারীদের পঙ্গু করার ঘটনার বিচার করা। সরকারের এক বছর পর এসব ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার এখন দৃশ্যমান। প্রধান আসামি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। সরকার ও প্রসিকিউশনের আশা, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনার মামলাসহ একাধিক মামলার রায় হয়ে যাবে। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণ হলেও হতাশাও রয়েছে। রাজনৈতিক সরকারগুলোর সময় অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি এবং নিয়ন্ত্রণ ছিল আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের হাতে। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে মুক্ত করতে একটি পৃথক সচিবালয়ের দাবি দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক সরকারের সময় বাস্তবায়িত না হলেও পৃথক সচিবালয়ের দাবি এ সরকারের সময়েও এখন পর্যন্ত পূরণ হয়নি।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দৃশ্যমান : গত বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ভবন সংস্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেল, প্রসিকিউশন শাখা, তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠনসহ আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এ বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। এখন পর্যন্ত পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও তদন্ত শাখায় ৪৫০টি অভিযোগ এসেছে। যার মধ্যে মামলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৩০টি। এসব মামলায় আসামি ২০৯ জন। ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৮৪ জন। যদিও গ্রেপ্তারদের তালিকায় শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ আসামিদের অনেকেই এখনো পলাতক। পলাতক শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা যাবে কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টিও সামনে আসছে। গত মঙ্গলবার ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘মাঝেমধ্যে মনে হয় জীবনের সবচেয়ে বড় শান্তির দিন থাকবে বিচারটা (মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার) যখন শেষ করতে দেখব। তবে, প্রধান যে আসামি (শেখ হাসিনা), প্রধান যে অপরাধী তার (শেখ হাসিনা) শেষদিন ভারতেই কাটবে। তাকে বোধহয় আমরা আর কখনো পাব না।’
গণঅভ্যুত্থানে প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আগামী ২৭ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে। এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়ায় আন্দোলনকারী ছয় তরুণকে গুলি করে হত্যার পর পুলিশ ভ্যানে লাশ পোড়ানোর ঘটনার মামলায় অভিযোগ গঠনের ওপর গতকাল শুনানি শুরু হয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আগামী ১১ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেল, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এবং অপরাধের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে হয়েছে। তারপর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার কারণে বিচার শুরু হতে সময় লেগেছে। তবে, এখন বিচার দৃশ্যমান। বিচারের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।’
এক বছরে যত উদ্যোগ
অভ্যুত্থানের পর প্রায় এক বছরে আইন এবং বিচার বিভাগের সংস্কারের অংশ হিসেবে বেশ কিছু ব্যবস্থা নেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। এরই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন-১৯৭৩ সংশোধন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫ প্রণয়ন, দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধন করা হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধিও সংশোধনের পথে রয়েছে। এ ছাড়া আইনগত সহায়তা প্রদান আইন সংশোধন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন ও আইনের সংশোধনী এনেছে সরকার। রাজনৈতিক সরকারের সময় উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে নানা, আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। এ নিয়ে একটি আইন তৈরির তাগিদ ছিল দীর্ঘদিনের। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশের আওতায় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিলের অধীনে এখন বিচারক নিয়োগ হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ৩০০-এর মতো আবেদন ও সেসব যাচাই-বাছাইয়ের পর ৫০ জনের বেশি প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের পদ সৃজনের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করে ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা, ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত করে। ২০১৬ সালে হাইকোর্ট ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। এ রায় ২০১৭ সালে আপিল বিভাগেও বহাল থাকে। ওই সময় আপিল বিভাগের এ রায় রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) চেয়ে আবেদন করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। গত বছর ২০ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ রিভিউ নিষ্পত্তি করে রায় দিলে বিচারকদের অসদাচরণে তাদের অপসারণ করতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১০ সালের ১০ মে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দিয়েছিল আপিল বিভাগ। পরে এ রায়ের আলোকে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ। গত বছর হাইকোর্ট নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাতিল ঘোষণা করে রায় দেয়। এ রায়ের ফলে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
পৃথক সচিবালয়ের দাবি এখনো পূরণ হয়নি
দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টে সারা দেশের অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ে অভিভাষণ অনুষ্ঠান করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। সেদিন বিচার বিভাগের সমস্যা নিয়ে বিচারকরাও কথা বলেন। প্রধান বিচারপতি তাদের সমস্যাগুলো শুনে বিচার বিভাগের সংস্কার নিয়ে নিজের চিন্তাভাবনা ও উদ্যোগের বিষয়ে রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার ওপর। এরই ধারাবাহিকতায় ২১ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা, বদলি, পদোন্নতি, ছুটিসহ অন্যান্য বিষয়ে স্বচ্ছতা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ‘বিচার বিভাগীয় সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। তবে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে সরকারের তরফে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য শোনা যায়নি।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয়ের দাবি দীর্ঘদিনের। অতীতে রাজনৈতিক সরকারগুলো সচেতনভাবেই স্বাধীন বিচার বিভাগ চায়নি। কেননা তাদের মধ্যে বিচার বিভাগকে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা গেছে। এ সরকারের সময় এ দাবি আরও জোরালো হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের সংস্কারের অংশ হিসেবে পৃথক সচিবালয়সহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিষয়টি সরকারের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে নেই।’