গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ‘নির্মম হত্যাকাণ্ডের’ শিকার সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছেন তার প্রিয় গ্রাম ভাটিপাড়ায়। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের কবরস্থানে তাকে শায়িত করা হয়। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গাজীপুরে থাকলেও নিয়মিত বাড়ি যেতেন তিনি।
বাবা-মার পাশাপাশি প্রতিবেশী-স্বজনদের নিয়ে কাটাতেন সময়। গতকালও তার বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। বলেছিলেন, বাবা-মায়ের সঙ্গে দুপুরের খাবার খাবেন...।
গতকাল তুহিন বাড়ি ফিরেছেন ঠিকই, তবে নিথর দেহে। আর কোনোদিনই বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান, ভাইবোনদের সঙ্গে বসে খাবার খাবেন না। আর কোনোদিন কোনো স্বজন বা সহকর্মীকে ডাকবেন না।
এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল হয়েছে। সাংবাদিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং স্থানীয় জনগণ হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
কী ঘটেছিল : গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ৫৮ মিনিটে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তার শাপলা ম্যানশন মার্কেটের সামনে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে একটি ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কালো জামা পরা এক নারী (গোলাপী বেগম) হাঁটছিলেন। এ সময় নীল শার্ট পরা এক যুবক (বাদশা মিয়া) তাকে পেছন থেকে টেনে ধরেন এবং চড়-থাপ্পড় মারেন। তখনই রামদা ও চাইনিজ কুড়ালে সজ্জিত একদল সন্ত্রাসী বাদশাকে আক্রমণের চেষ্টা করে। বাদশা দৌড়ে পালিয়ে যান। এ সময় সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন তার সহকর্মী মো. শামীম হোসেনের সঙ্গে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি একটি দোকানে ছিলেন। শামীম জানান, তারা রাস্তা দিয়ে যখন হাঁটছিলেন তখন এ ঘটনা শুরু হয়। সন্ত্রাসীরা বাদশাকে তাড়া করার সময় তুহিন তার মোবাইলে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। সন্ত্রাসীরা তুহিনকে মোবাইল হাতে দেখে তার দিকে তেড়ে আসে। তুহিন দৌড়ে চান্দনা চৌরাস্তা ঈদগাহ মার্কেটের পূর্বপাশে একটি দোকানে আশ্রয় নেন। কিন্তু সন্ত্রাসীরা সেখানে ঢুকে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়। এর মধ্যে শামীম বাসন থানার ওসি মো. শাহীন মিয়াকে ফোন করেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গাজীপুরের বাসন, ভোগড়া ও চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ছিনতাইকারীদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা সন্ত্রাসীদের এই চক্রের সদস্য বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে মিজান ওরফে কেটু মিজান, শাহ জামাল, বুলেট ও সুজনের নাম উল্লেখযোগ্য। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। পুলিশ ধারণা করছে, গোলাপী বেগমও এই চক্রের সদস্য।
মামলা ও গ্রেপ্তার : হত্যার ঘটনায় তুহিনের বড় ভাই মো. সেলিম মিয়া বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে বাসন থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। গতকাল রাতে তুহিন হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে এক দম্পতিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন মো. মিজান ওরফে কেটু মিজান, তার স্ত্রী গোলাপী, মো. স্বাধীন ও আল-আমিন। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। তারা ছিনতাইকারী দলের সদস্য।
এর আগে গতকাল সন্ধ্যায় পুলিশ জানায়, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। তবে সেই সময় তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
জানাজা ও দাফন : গতকাল সকালে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তুহিনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর বাদ জুমা চান্দনা চৌরাস্তা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে তার প্রথম জানাজা হয়। জানাজায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এনসিপির নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক সমাজ এবং স্থানীয় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। জানাজার আগে গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম মঞ্জুরুল করিম রনি, এনসিপির উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম সংগঠন অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান এবং সাংবাদিক নেতারা হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এরপর তুহিনের মরদেহ ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থানার ভাটিপাড়া গ্রামে নেওয়া হয়। সেখানে দ্বিতীয় জানাজার পর তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
শোকের গ্রাম ভাটিপাড়া : গতকাল বিকেলে তুহিনের মরদেহ ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে পরিবারের সদস্যদের কান্না ও আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। আশপাশ থেকে রাতেই তুহিনের বাড়িতে ছুটে আসেন প্রতিবেশী ও স্বজনরা। তুহিনের বাবা-মা, ভাইবোনদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তারাও কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তুহিনের বাবা হাসান জামাল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে আমার জন্য ওষুধের টাকা পাঠাত, আমার খোঁজ নিত। আমি অসুস্থ হলে তার মন খারাপ হতো। তাকে প্রকাশ্যে খুন করা হয়েছে, এটা সইতে পারছি না। আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও।’
তুহিনের মা সাহাবিয়া খাতুন বলেন, ‘গত পরশু ছেলে মোবাইলে নাতিদের সঙ্গে কথা বলিয়েছিল। এরপর আর কথা হয়নি। কারা আমার ছেলেকে মারল, তার কী দোষ ছিল?’
তুহিনের স্ত্রী ফরিদা আক্তার দুই শিশুসন্তান নিয়ে শোকে স্তব্ধ। তুহিনের ছোট ছেলে ফাহিম বারবার বাবার কথা জিজ্ঞাসা করছিল।
বাদ মাগরিব সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এভাবে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তুহিনরা পাঁচ ভাই। প্রত্যকেই কাজের তাগিদে সিলেট ও গাজীপুরে থাকেন। তারা কেউ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। তুহিন খুব ভালো ছেলে ছিলেন। নিয়মিত বাবা-মায়ের সেবা ও খোঁজখবর নিতেন। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।’
মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিক্রিয়া : হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) তুহিনের হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘আসাদুজ্জামান তুহিন পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সন্ত্রাসীদের ভিডিও ধারণ করছিলেন, যা সাংবাদিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ হত্যাকাণ্ড শুধু একটি মানবজীবনের করুণ পরিণতি নয়, এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত।’ তিনি বলেন, ‘এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, সন্ত্রাসীরা আইনের প্রতি ভীত নয় এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা তাদের দুঃসাহস বাড়াচ্ছে।’
ইজাজুল ইসলাম জোর দিয়ে বলেন, ‘শুধু সাময়িক গ্রেপ্তার বা চোখে ধুলো দেওয়া নয়, প্রকৃত অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য একটি স্বতন্ত্র ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান, যাতে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্র রক্ষা পায়।
বাংলাদেশ মানবাধিকার ফোরামের একজন প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘তুহিনের হত্যা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি দেশে সাংবাদিকদের ওপর ক্রমবর্ধমান হুমকির প্রতিফলন। সরকারকে অবশ্যই সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’
বিক্ষোভ ও বিচারের দাবি : তুহিনের হত্যার প্রতিবাদে গাজীপুর প্রেস ক্লাবের সামনে গতকাল সকালে সাংবাদিক ইউনিয়ন গাজীপুরের উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন। বক্তব্য রাখেন প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মুজিবুর রহমান, মাজহারুল ইসলাম মাসুম, সাধারণ সম্পাদক শাহ সামসুল হক রিপন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল আহমদ সরকার, ফজলুল হক মোড়ল, শরীফ আহমেদ শামীম, ফারদিন ফেরদৌস প্রমুখ।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলা পরিষদ চত্বরে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় স্থানীয় সাংবাদিকরা মানববন্ধন করেন। ফুলবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি আব্দুল হান্নান বলেন, ‘তুহিন আমাদের এলাকার গর্ব ছিলেন। তার হত্যা শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো সমাজের ক্ষতি। আমরা তিন দিনের মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।’
নারায়ণগঞ্জে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের উদ্যোগে বাদ জুমা ডিআইটি জামে মসজিদের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মুফতি মাসুম বিল্লাহ। বক্তারা বলেন, ‘জনসমাগমপূর্ণ সময়ে একজন সাংবাদিককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির প্রমাণ।’
মিছিল শেষে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে তুহিনের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল হয়।
গতকাল দুপুরে দিনাজপুর প্রেস ক্লাবের সামনে সাংবাদিক সমাজ মানববন্ধন করে। দিনাজপুর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার দাস বলেন, ‘তুহিনের হত্যা সাংবাদিকতার ওপর আক্রমণ। আমরা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও দিনাজপুর প্রতিনিধি