চলতি বছরের বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সাহসী নতুন বিশ্বে সাংবাদিকতা : গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব’। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা সাংবাদিক নির্যাতন-নিপীড়ন আজও অব্যাহত। খবর সংগ্রহ বা অনুসন্ধানের জন্য সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। কৌশলে নির্যাতন এবং সুযোগবুঝে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। ১৯৯২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৩ বছরে বাংলাদেশে ৩৫ সাংবাদিক খুন হয়েছেন বলে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ১৯৬ সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারহীনতাই সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাকে উসকে দিচ্ছে।
সাংবাদিক নির্যাতন বা হত্যা বিশ্বে নতুন নয়। সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ ও সঠিক সংবাদ পরিবেশনের কারিগর। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য সংবাদ প্রকাশ এবং গণমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পরিবেশনের ফলে জনমনে প্রভাব পড়ে। এতে অন্যায়, শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে ওঠে, যেখানে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক মানবতার পক্ষে শক্তি হিসেবে কাজ করেন। তারা সামাজিক অবক্ষয় এবং রাষ্ট্রীয় শোষণ-নিপীড়নের সঠিক চিত্র তুলে ধরেন। ফলে সাংবাদিকরা নিপীড়ন, নির্যাতন এবং হত্যার শিকার হন। এ নিপীড়ন শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে। অনেকের জীবন বিপন্ন হয়, পরিবার সংকটে পড়ে। সত্যের পক্ষে থাকায় সাংবাদিকরা সবসময় রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও রোষানলে থাকেন। একই কারণে অপরাধী চক্র এবং কখনো রাষ্ট্রপুঞ্জ সাংবাদিক নিপীড়নের পৃষ্ঠপোষকতা করে। ফলে সাংবাদিকরা সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ গবেষক ড. তৌহিদুল হক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাংবাদিকদের ওপর প্রায়ই হামলার ঘটনা ঘটছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব হামলার সঙ্গে প্রভাবশালীরা জড়িত। ফলে এসব ঘটনার বিচার প্রায় হয় না। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হলে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন। সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে সত্যকে আড়াল করা যায় না। গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ, এর কর্মীদের ওপর হামলার পরিবর্তে প্রভাবশালীরা নিজেদের সংশোধন করলে সমাজ উপকৃত হবে।
এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ১৯৬ সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ৬৬ জন মারধরের শিকার, সংবাদ প্রকাশের জেরে ৪৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা, ৩১ জন মব বা জঙ্গি হামলার শিকার, বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের হামলায় ১৭ জন, বিক্ষোভ-কর্মসূচিতে ১৩ জন এবং ৮ জন সাংবাদিক মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার কারণ জানতে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, অবৈধ কাজে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হলে তারা ক্ষিপ্ত হয়। ফলে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মারধর এমনকি হত্যা পর্যন্ত ঘটে। সাংবাদিকতা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের উচিত সাংবাদিকদের জন্য ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থা চালু করা। উন্নত দেশগুলোতে সাংবাদিকদের ইন্স্যুরেন্স থাকে, যারা হামলা বা অঙ্গহানির শিকার হন, তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। অপরাধীদের কাছ থেকেও ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাংবাদিকদের লেখনী সত্য তুলে আনে। তাই এক দল মানুষ তাদের ভালোভাবে দেখে, আরেক দল শত্রুতা করে। সত্যাশ্রয়ী মানুষ ছাড়া সাংবাদিকদের বন্ধু নেই। দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজরা সাংবাদিকদের শত্রু। বাকস্বাধীনতার জন্য আমরা দীর্ঘদিন লড়েছি। ভেবেছিলাম ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর নিরাপদে কাজ করা যাবে, কিন্তু তা হয়নি। নির্যাতন, নিপীড়ন ও হত্যা আগের মতোই চলছে। এ থেকে মুক্তির উপায় হলো ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ এবং সরকারকে বিচার নিশ্চিত করতে বাধ্য করা।
তিনি বলেন, সাংবাদিক হত্যার বিচার বছরের পর বছরেও শেষ হয় না। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড এর উদাহরণ। একসময় যারা এ হত্যার বিচার দাবি করে বাণিজ্য করেছিল, তারা এখন নীরব।