সারের দাম বাড়ছে পরিবহন ব্যবসায়ী-ডিলার সিন্ডিকেটে

আমদানি এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সার পরিবহনের সঙ্গে জড়িত ঠিকাদার ও ডিলারদের সিন্ডিকেটের কারণে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে সারের বাজারে। এই সিন্ডিকেট ‘কৃত্রিম’ সরবরাহ সংকট তৈরি করেছে; ফলে কৃষককে সার কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন পিক সিজনে (নভেম্বর-মার্চ) সারের সরবরাহ ও দাম নিয়ে সংকট তৈরির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে যে পরিমাণ সারের মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে আগামী তিন মাস চাহিদা মেটানো যাবে। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, এ বছর রাসায়নিক সারের চাহিদা রয়েছে ৫৭ দশমিক ৮৫ লাখ টন। চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সরকারিভাবে আমদানি করা হয়। বাকি ২০ শতাংশ সার দেশের সার কারখানার উৎপাদন থেকে মেটানো হয়। তবে দেশের পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে তিনটি কারখানাই গ্যাস সংকটে বন্ধ রয়েছে। ডিএপি ও টিএসপি উৎপাদনকারী দুটি কারখানা চালু থাকলেও চাহিদার বেশিরভাগ সারই আমদানি করতে হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মাধ্যমে সার আমদানি করে থাকে। সমস্যা হলো, আমদানি করা সার জাহাজ থেকে খালাস করতে ইচ্ছেকৃতভাবে দেরি করা হচ্ছে, সারবাহী পরিবহন দেরি করে গুদামে আসছে। আর এভাবেই পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থায় থাকা ব্যক্তিরা সিন্ডিকেট করে বাজারে সার সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করছে। যে কারণে বাজারে খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে কৃষককে।

জানা যায়, সম্প্রতি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ ও ডিমলা, ঝিনাইদহের শৈলকূপাসহ কয়েকটি উপজেলায় ডিলাররা তাদের বরাদ্দকৃত সার অবৈধ মজুদ করে সংকট তৈরি করে। ফলে ৫০ কেজির যে ডিএপি সার ১ হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি করার কথা, সেটা বিক্রি হচ্ছে ১৪০০-১৭০০ টাকায়। এতে করে এসব এলাকার কৃষকরা সার না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একইভাবে রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলায় সম্প্রতি ৬০ বস্তা সার প্যারাগন কোম্পানি উপজেলার গোডাউনে মজুদ না করে নীলফামারী জেলার ডিমলায় নিয়ে যাচ্ছিল। পথে স্থানীয় কৃষকরা আটক করে প্রশাসনে খবর দিলে সেগুলো পুনরায় গঙ্গাচড়া উপজেলার গোডাউনে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের প্রতিটি জেলায় মৌসুমের চাহিদা অনুযায়ী ডিলারের কাছে সার সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে পরিবহন ব্যবসায়ী ও ডিলাররা সিন্ডিকেট করে দেশে সারের সরবরাহ ঘাটতি দেখিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ নিচ্ছে।

বিএডিসি ও বিসিআইসির সার পরিবহনের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট লাইসেন্সধারী পরিবহন ঠিকাদার রয়েছে, যারা সবসময় সার পরিবহন করে থাকে। ডিলার সংগঠন ও পরিবহন কোম্পানির মিলেমিশে সার যথাসময়ে খালাস করছে না, আবার খালাস করা সারও নির্ধারিত সময়ে গুদামে পৌঁছে দিচ্ছে না। এতেই তৈরি হচ্ছে বড় সংকট। দুটি প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে ৭ হাজার ১৫০ জন ডিলার রয়েছেন। যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া। জানা গেছে, এ তালিকায় একই ব্যক্তি রয়েছে; যারা ভিন্ন ভিন্ন নামে একাধিক ডিলারশিপ নিয়ে এ খাতকে কুক্ষিগত করে রেখেছেন।

সম্প্রতি কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, এখন থেকে রাজনৈতিক পরিচয়ে কোনো ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে না।

 

আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বেশি, আমদানিতে শঙ্কা : প্রায় দুই মাসের বেশি সময় ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন প্রকারের সারের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ডিএপি সারের দাম। জানা গেছে, দুই-তিন মাসের ব্যবধানে ডিএপি সারের দাম বেড়েছে ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত। বর্তমানে এফওবি মূল্যই দাঁড়িয়েছে টনপ্রতি প্রায় ৮০০ ডলারের কাছাকাছি।

নওয়াপাড়া ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফাইজুর রহমান বকুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের সারের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ডিএপি সারের দাম। চায়না সার রপ্তানি কমিয়ে দেওয়ার কারণেই বাজার চড়া বলে জানান তিনি।

জানা যায়, চায়না নিজেদের বাজার স্থিতিশীল রাখা ও চাহিদার বাড়তি সার মজুদের লক্ষ্য ঠিক করেছে। যে কারণে তারা সারের রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত সময়ে ডিএপি সার রপ্তানি করেছিল সাড়ে ৯ লাখ টন। যেটা এ বছরের তিন মাসে করেছে মাত্র ১৩০০০ টন। একইভাবে ইউরিয়ার রপ্তানিও কমিয়ে দিয়েছে। যেখানে প্রতি বছর ৫০-৫৫ লাখ টন ইউরিয়া রপ্তানি করে, যেখানে ২০২৫-এর এ পর্যন্ত রপ্তানির পরিমাণ খুবই সামান্য।

আন্তর্জাতিক বাজারে নন ইউরিয়া হিসেবে পরিচিত ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি সারের মূল রপ্তানিকারকদের মধ্যে রয়েছে মরক্কো, রাশিয়া, চীন, সৌদি আরব, তিউনেশিয়া, বেলারুশসহ হাতেগোনা কয়েকটি দেশ। এর মধ্যে চীনের মতো বড় সরবরাহকারী যদি সারের রপ্তানি কমিয়ে দেয়, সেটা আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। যদিও বিএডিসি এ বছরের শুরুতে চীনের বানিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেডের মধ্যে চুক্তি করেছে ৪ লাখ ৪০ হাজার টন সার আমদানির।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এ বছর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সার সরবরাহ করাটা বাংলাদেশের জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হবে। কারণ একদিকে সরবরাহ সংকট, অন্যদিকে বাড়তি দাম। এজন্য সরকার যেসব দেশ থেকে সচরাচর সার আমদানি করে না সেসব দেশের সঙ্গেও চুক্তি করতে শুরু করেছে। সম্প্রতি বিএডিসি এবং মালয়েশিয়ার ফেলক্রা নিয়াগা এসডিএন বিএইচডির মধ্যে এক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। যদিও এ কোম্পানিটি নিজে সার উৎপাদন করে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, কেন এ কোম্পানিটির সঙ্গে বিএডিসি হঠাৎ করে সার আমদানির চুক্তি করল। এ চুক্তির আওতায় বিএডিসি গত ১৭ জুলাই মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের একটি হোটেলে হওয়া এ চুক্তির আওতায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন করে সার টিএসপি ও ডিএপি সার আমদানি করবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর আগে এই কোম্পানির কাছ থেকে বিএডিসি কখনোই সার আমদানি করেনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএডিসি ও বিসিআইসির কাছে আগামী তিন মাসের জন্য পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারের এই অবস্থার কারণে পিক সিজনের সার আমদানিতে বাড়তি চাপ থাকবে, যা সামাল দিতে না পারলে সংকটে পড়তে হতে পারে। কারণ, সার আমদানি একেকটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ছয়-আট মাস পর্যন্ত সময় লাগে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বর্তমানে সরকারের কাছে জুলাই শেষে ৬ লাখ ৩০ হাজার ৬১৩ টন ইউরিয়া সারের মজুদ রয়েছে। যেখানে নিরাপত্তা মজুদ ৪ লাখ টন বাদে ব্যবহারযোগ্য সার রয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৬১৩ টন। বিসিআইসির পর্যাপ্ত মজুদের ব্যবস্থাপনা না থাকায় নিরাপত্তা মজুদ ৭ লাখ টন থেকে কমিয়ে ৪ লাখ টন করা হয়েছে। এ ছাড়া ২ লাখ ১৭ হাজার টন টিএসপি, ২ লাখ ৭৩ হাজার টন ডিএপি এবং ২ লাখ ৮১ হাজার টন এমওপি সার রয়েছে। যদিও এর মধ্যে ২৫ হাজার টন টিএসপি, ১ লাখ ১০ হাজার টন এমওপি এবং ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিএপি সার এখনো জাহাজে রয়েছে।