ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ডিটেল এরিয়া প্ল্যান-ড্যাপ) সংশোধনী প্রায় চূড়ান্ত। সব ঠিক থাকলে উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদন পেয়ে আগামী মাসে ড্যাপের সংশোধনী চূড়ান্ত হতে পারে। তবে এ সংশোধনীতেও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি কোনো পক্ষ। নানা বিষয় নিয়ে এখনো আপত্তি আছে অংশীজনদের মধ্যে। তবে এ সংশোধনী প্রস্তুত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে ৩৭টি সভা করতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ড্যাপ ও ইমারত বিধিমালা সংশোধনের জন্য মোট ৩৭টি সভা হয়েছে। এর মধ্যে উপদেষ্টা পর্যায়ে ৩টি, সচিব পর্যায়ে ৪টি, মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটির ১০টি এবং রাজউকে অংশীজনদের সঙ্গে ২০টি বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে নানা প্রস্তাব ও মতামতের ভিত্তিতে খসড়ায় ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়।
এতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি), বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (আইএবি) ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) ঐকমত্যের ভিত্তিতে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এফএআর (ফ্লোর এরিয়া রেশিও), জনঘনত্ব ও আবাসন ইউনিটে কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। তাছাড়া বন্যা প্রবাহ এলাকায় ও গ্রামীণ প্রকৃতি সব বেশ কিছু বিষয়ে সংশোধনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সবশেষ গত রবিবার সচিবালয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ড্যাপের খসড়াটি অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তী ধাপে এটি ড্যাপ-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটিতে পাঠানো হবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য। সব ঠিক থাকলে এক মাসের মধ্যে গেজেট প্রকাশ করা হবে।
বৈঠকে বিদ্যমান রাস্তার ভিত্তিতে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর), এলাকাভিত্তিক এফএআর ও জনঘনত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গ্রামীণ এলাকার (যেমন দাসেরকান্দি, কাঁচপুর, ময়নারটেক, আলীপুর, রুহিতপুর, বিরুলিয়া, বনগ্রাম ইত্যাদি) মোট ১৬টি জনঘনত্ব ব্লকের এফএআর সামান্য সমন্বয় করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ও নগর এলাকার এফএআর আগের মতো বহাল থাকবে। এ ছাড়া ২০১১ সালের বিবিএস হাউজহোল্ড সাইজ বিবেচনায় আবাসন ইউনিট নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়।
তাছাড়া ড্যাপের (২০২২-৩৫) নীতিমালায় প্রতি পাঁচ বছর অন্তর আপডেটের বিধান থাকায় আগামী এক বছরের মধ্যে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে পরিকল্পনার উন্নয়ন ও আপগ্রেডেশন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই কমিটি ঢাকার বাসযোগ্যতা বাড়াতে রাজউককে নীতি ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেবে।
সংশোধিত ড্যাপের খসড়া প্রস্তাবনায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ এলাকায় এফএআর, জনঘনত্ব এবং আবাসিক ইউনিট বাড়ানো হয়েছে। তবে কিছু কিছু এলাকায় এফএআর কমানো হয়েছে। এতে কোনো পক্ষই পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেক মিটিং করে ড্যাপ সংশোধন করা হচ্ছে। এটি যাতে গ্রহণযোগ্য হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ২০ থেকে ২২ ফুটের কম প্রশস্ততার সড়কে যে এফএআর দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আমাদের আপত্তি আছে। এটা ঠিক হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমরা আবার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসব।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ড্যাপ সংশোধনে আবাসন ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। তবে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা, অবকাঠামো ও বসতি বিবেচনায় ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। শহরের পরিবেশ প্রতিবেশ ধ্বংস হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। আমরা বৃহত্তর স্বার্থে একটা জায়গায় ঐকমত্য হয়েছি। আশা করব সরকার কারও চাপে পড়ে নগরের পরিবেশ বিধ্বংসী কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।
সংশোধিত খসড়া পর্যালোচনা : ধানম-ি আবাসিক এলাকা, যা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৫, ১৭ ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ড এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩১, ৩২, ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড। বিদ্যমান ড্যাপে জনঘনত্ব ছিল প্রতি একরে ২০০ জন, এফএআর (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) ছিল ৫ দশমিক ১ এবং আবাসন ইউনিট ছিল ৭ দশমিক ১ (কাঠাপ্রতি)। এই এলাকায় জনঘনত্ব বাড়িয়ে ২২০ প্রস্তাব করা হয়েছে, তাছাড়া এফএআর ৫ এবং আবাসন ইউনিট ১ দশমিক ৭৪ করা হয়েছে।
বিদ্যমান ড্যাপে ডিএনসিসির ১৯ নম্বর ওয়ার্ড গুলশান বনানী এলাকায় জনঘনত্ব ২০০ জন ছিল। একই সঙ্গে এফএআর ৫ দশমিক ৭ এবং আবাসন ইউনিট ১ দশমিক ৭ ছিল। সংশোধন করে এই এলাকায় জনঘনত্ব ২৫০, এফএআর ৫ দশমিক ৫ এবং আবাসন ইউনিট ১ দশমিক ৮ করা হয়েছে।
ডিএনসিসির ১, ৫১, ৫২ ও ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড উত্তরা এলাকায় বিদ্যমান ড্যাপে জনঘনত্ব ছিল ২০০ জন, এফএআর ৪ দশমিক ৩ এবং আবাসন ইউনিট ছিল ১ দশমিক ৭। সংশোধিত ড্যাপে এই এলাকার জনঘনত্ব ৩০০ জন, এফএআর ৪ দশমিক ৫ এবং আবাসন ইউনিট ২ দশমিক ৪ প্রস্তাব করা হয়েছে। আবার উত্তর এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ড এবং ৫২ ও ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু অংশে এফএআর ৪ দশমিক ৬ ঠিক রেখে জনঘনত্ব ও আবাসন ইউনিট বাড়িয়ে যথাক্রমে ২৫০ ও ১ দশমিক ৮ করা হয়েছে। ডিএনসিসির ২১, ৩৭, ৩৮ ও ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড বাড্ডা এলাকায় জনঘনত্ব ছিল ২০০ জন, এফএআর ২ এবং আবাসন ইউনিট ছিল ১ দশমিক ৬। সংশোধিত ড্যাপে এই এলাকায় জনঘনত্ব ২৫০, এফএআর ৩ দশমিক ৩ এবং আবাসন ইউনিট ১ দশমিক ৯৭ ধরা হয়েছে।
মিরপুর এলাকায় জনঘনত্ব ২২০ থেকে ২৫০ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এফএআর ২ দশমিক ৮ থেকে ৩ দশমিক ৪ এবং আবাসন ইউনিট ১ দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ৭৭ করা হয়েছে। মগবাজার এলাকার জনঘনত্ব ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০, এফএআর ২ দশমিক ২ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ২ এবং আবাসন ইউনিট ১ দশমিক ৯ থেকে ২ দশমিক ৮ করা হয়েছে। সাঁতারকুল নাছিরাবাদ এলাকায় জনঘনত্ব ২০০ থেকে বাড়িয়ে ২২০ করা হয়েছে। তবে এফএআর ২ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৯, আবাসন ইউনিট ১ দশমিক ৬ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ২৪ করা হয়েছে। গ্রামীণ প্রকৃতি রক্ষার্থে এখানে এফএআর ও আবাসন ইউনিট কমানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ডেমরা মাতুয়াইল এলাকার জনঘনত্ব ২০০ থেকে বাড়িয়ে ২৫০, এফএআর ২ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ১ এবং আবাসন ইউনিট ১ দশমিক ৬ থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৭৩ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ শহর এবং বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় জনঘনত্ব ২০০ থেকে বাড়িয়ে ২৫০, এফএআর ২ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৫ এবং আবাসন ইউনিট ১ দশমিক ২ থেকে বাড়িয়ে ২ দশমিক ২৬ প্রস্তাব করা হয়েছে। তাছাড়া সাভার পৌর এলাকা ও তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের কিছু অংশে এফএআর ২ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৪ করা হয়েছে। টঙ্গী এলাকায় এফএআর ২ দশমিক ৪ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ২, ঝিলমিল আবাসিক এলাকায় এফএআর ৪ থেকে বাড়িয়ে ৪ দশমিক ২, খিলক্ষেত আবাসিক এলাকায় ২ থেকে বাড়িয়ে ৪ দশমিক ৪ এবং খিলক্ষেত ভাটারা এলাকার এফএআর ২ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ১ করা হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) হলো একটি প্লটে কতটুকু জায়গা নিয়ে ভবন নির্মাণ করা যাবে তার অনুপাত। উদাহরণস্বরূপ ১ হাজার বর্গফুট জমির এফএআর যদি ১ দশমিক ৫ হয়, তবে মোট ফ্লোর স্পেস হবে ১ হাজার ৫০০ বর্গফুট। সেই প্লটে পাঁচতলা ভবন হলে প্রতিতল হবে ৩০০ বর্গফুট। এফএআর শহর পরিকল্পনা ও ভবন নির্মাণের ঘনত্ব ও উচ্চতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সংশোধিত ড্যাপে ‘সেটব্যাক এলাকা’ ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত রাখা হচ্ছে। সেটব্যাক এলাকা বলতে প্লটের যে অংশ ফাঁকা রেখে ভবন নির্মাণ করতে হয় সেটি বোঝায়। পাশাপাশি আলো-বাতাস নিশ্চিত করতে দুটি ভবনের মধ্যে কৌণিক দূরত্ব কমপক্ষে ৭২ ডিগ্রি রাখার বিষয়টি বিবেচনা করছে রাজউক।
রাজউকের প্রধান পরিকল্পনাবিদ এবং ড্যাপ প্রকল্পের পরিচালক আশরাফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া সংশোধনী নিয়ে কাজ করছে রাজউক। উপদেষ্টা পরিষদে পাস হওয়াসহ সব প্রক্রিয়া শেষ হতে এক মাসের মতো সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের ২৪ আগস্ট গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বর্তমান ড্যাপ (২০২২-৩৫) কার্যকর করে গেজেট প্রকাশ করে। এরপর থেকেই আবাসন কোম্পানি ও জমির মালিকসহ বিভিন্ন পক্ষ এর সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছিল। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও ডেভেলপার কোম্পানিগুলো বারবার এ দাবি জানায়। সর্বশেষ গত ২০ মে ঢাকা সিটি ল্যান্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন রাজউকের প্রধান কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে।