কুমিল্লায় উন্নয়নকাজে অনিয়ম

৪০ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৩ কোটি টাকা জরিমানা

কাজের গুণগত মান বজায় রাখা ও সময়মতো কাজ শেষ নিশ্চিত করতে কুমিল্লায় বড় ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, গাফিলতি, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং কাজ অসম্পূর্ণ রাখার অভিযোগে ৪০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার বেশি জরিমানা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠানের চলমান কাজ বাতিল এবং ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্পে অংশগ্রহণের লাইসেন্সও বাতিল করা হয়েছে।

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, এ ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এ বছরেই প্রথমবারের মতো এত বড় পরিসরে নেওয়া হয়েছে। জেলা জুড়ে বিস্তৃত বিভিন্ন সড়ক, কালভার্ট ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে একাধিকবার তদারকির সময় অসংখ্য অনিয়ম ধরা পড়ে। উল্লেখযোগ্য একটি প্রকল্প হলো কুমিল্লার কোটবাড়ি রাজারখোলা থেকে শ্রীবিদ্যা হয়ে বড়ধর্মপুর পর্যন্ত সড়কটি। সাড়ে ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সড়ক সংস্কারে যৌথভাবে কাজ করছে মদিনা কনস্ট্রাকশন ও ল্যান্ডমার্ক বিল্ডার্স। পাঁচ বছর আগে কাজ শুরু হলেও এখনো সড়কটি সম্পূর্ণ সংস্কার হয়নি। বরং খানাখন্দে ভরা এই সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য রীতিমতো দুর্ভোগের আরেক নাম।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইলিয়াস বলেন, ‘দু'মাস আগে কিছু পাথর ঢালাই হয়েছিল, কিন্তু বৃষ্টির পানিতে সব উঠে গেছে। কাজ বন্ধ পড়ে আছে। এখনো ঠিকঠাক রাস্তা দিয়ে হাঁটাও যায় না। এই প্রকল্পে গাফিলতির দায়ে ওই দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা জরিমানা করেছে এলজিইডি।

এলজিইডির কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন প্রকল্প পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, শুধু একটি বা দুটি প্রকল্পেই নয়—জেলাজুড়ে অন্তত ৪০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনিয়মে জড়িত। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করা, বাজেট বরাদ্দের অপচয়, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কাজ ফেলে রাখা, অপরিকল্পিত খনন ও নির্মাণ এসব অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে এলজিইডি কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আশরাফ জামিল বলেন, “সরকার টাকা দিচ্ছে সুফলের জন্য। কিন্তু ঠিকাদাররা সেই টাকার সঠিক ব্যবহার না করে মানুষকে বিপদে ফেলছে। উন্নয়নের নামে এই অর্থ আত্মসাৎ বড় অপরাধ। তাই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, জেলায় প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই একাধিক প্রকল্পে এমন অনিয়ম দেখা গেছে। এর ফলে জনভোগান্তির পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, যা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

মানবাধিকার বিষয়ক পরামর্শক ও বিশ্লেষক আলী আকবর মাসুম বলেন, “উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত করার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। যারা ঠিকাদারি করেন, তারা অনেক সময় দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কাজ নিয়ে থাকেন। ফলে কাজের গুণগত মান, জবাবদিহিতা—সবই দুর্বল হয়ে পড়ে।”

তিনি আরও বলেন. “এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে শুধু জরিমানা নয়, সামগ্রিক ব্যবস্থাটিকেই ঢেলে সাজাতে হবে। পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে পেশাদারিত্ব এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।”

কুমিল্লা নগরীর বাসিন্দা ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা মো. আবদুল হান্নান বলেন, “প্রতিটি প্রকল্পই আমাদের ট্যাক্সের টাকায় হয়। কিন্তু এসব কাজের সুফল আমরা পাচ্ছি না। বরং বছরের পর বছর খোঁড়াখুঁড়ি, ধুলাবালি আর যানজটে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে।”

তিনি আরও বলেন, “শুধু ঠিকাদারকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। যে দপ্তর প্রকল্প অনুমোদন করে, যারা কাজের মান যাচাই করে, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।”

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এখন থেকে কোনো প্রকল্পেই নিম্নমানের উপকরণ, ধীরগতি কিংবা গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দিয়ে তদারকি জোরদার করা হয়েছে।

এলজিইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আগে এমন পদক্ষেপ খুব একটা নেওয়া হতো না। কিন্তু এখন আমরা কঠোর অবস্থানে গিয়েছি। কারণ এই অনিয়ম থামানো না গেলে মানুষ সরকারের উন্নয়নকেও প্রশ্নবিদ্ধ মনে করবে।”