মিসরের মরুভূমি যেন সময়ের থেমে থাকা ঘড়ি। সেই নির্জনতার বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে কিছু বিশালাকার পাথরের পাহাড় যাদের মানুষ পিরামিড নামে চেনে। এগুলো কেবল স্থাপত্য নয়, এগুলো ইতিহাসের স্তবগান, সভ্যতার অক্ষরবৃত্ত আর মানুষের অদম্য স্বপ্নের অবিনশ্বর দলিল।
নাইলের (নীল নদ) তীর ঘেঁষে বিস্তৃত সেই বালুর সাগরে দাঁড়িয়ে থাকা গিজার মহাপিরামিডের দিকে তাকালে মনে হয়, এ যেন পৃথিবীর বুকের স্পন্দন। খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ সালের দিকের সেই অদ্ভুত সময়, যখন ফারাও খুফু তার অমরত্বের স্বপ্নে এই পাথরের সাম্রাজ্য নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রায় আড়াই মিলিয়ন চুনাপাথরের ব্লক, প্রতিটির ওজন দুই থেকে পনেরো টনের মধ্যে, কোনো আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই কীভাবে স্থাপন করা হলো এই প্রশ্নের উত্তর আজও কেবল রহস্য।
পিরামিডের ভেতর ঢুকলেই এক অদ্ভুত নীরবতা ঘিরে ধরে। সরু করিডর, অন্ধকার গোপন চেম্বার, দেয়ালে খোদাই করা হায়ারোগ্লিফিক লিপি যেন ফিসফিস করে বলে যায় ফারাওদের আত্মার কথা। প্রাচীন মিসরীয়রা বিশ্বাস করত, মৃত্যু শেষ নয়; বরং আরেক জীবনের শুরু। আর সেই জীবনের দ্বার খুলে দেওয়ার জন্যই এই বিশাল সমাধি। প্রতিটি পাথরের স্তরে স্তরে যেন লুকিয়ে আছে অমরত্বের আকুতি, সময়ের বুক চিবে অনন্তে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা।
পিরামিডের রহস্য কেবল এর স্থাপত্যে নয়, এর জ্যোতির্বিদ্যাগত নিখুঁততায়ও। গবেষকরা অবাক হয়ে দেখেছেন গিজার মহাপিরামিড পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ অক্ষের সঙ্গে এমনভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে আধুনিক জিপিএস প্রযুক্তি দিয়েও ত্রুটি ধরা যায় না। আরও আশ্চর্যের বিষয়, এর অবস্থান পৃথিবীর ভূ-ভাগের প্রায় গাণিতিক কেন্দ্রবিন্দুর কাছাকাছি। ইতিহাসবিদদের ভাষায়, এটি কেবল সমাধি নয়; বরং প্রাচীন বিজ্ঞানের গোপন পাঠশালা।
পিরামিডকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কিংবদন্তি। কেউ বলেন, এটি ভিনগ্রহের বুদ্ধিমত্তার ফসল; কেউ বলেন, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে প্রাচীন বিশ্বের হারানো জ্ঞানভা-ার। তবে যত তত্ত্বই উঠুক, একটি সত্য অবিসংবাদিত-পিরামিড মানবতার সৃষ্টিশীলতার সীমা ভেঙে দেওয়া এক মহাকাব্য।
আজও যখন সূর্য অস্ত যায় গিজার বালুর ওপর, তখন রক্তিম আলোয় পিরামিডের ছায়া যেন ফিসফিস করে বলে ‘আমরা কেবল পাথর নই, আমরা সময়ের বুকের লেখা অমর কবিতা।’ হাজার বছরের ঝড়, মরুভূমির ধূলিঝঞ্ঝা, সভ্যতার উত্থান-পতনের মাঝেও পিরামিডের বুকের ভেতর ধুকপুক করছে সেই চিরন্তন বার্তা-মানুষের স্বপ্ন অমর, সময়ের হাতও তাকে হারাতে পারে না।
আজকের আধুনিক বিশ্বে দাঁড়িয়ে পিরামিডের দিকে তাকালে মনে হয়, এটি শুধু ইতিহাস নয়, এটি ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। যতদিন মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে স্বপ্নের আগুন, ততদিন গিজার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই পাথরের কবিতা বলে যাবে অমরত্ব কেবল দেবতাদের নয়, মানুষেরও হতে পারে।
লেখক : শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিসর