তোমরা জানো, মানুষ চাঁদে চলে গেছে। মঙ্গলে পাঠিয়েছে রোবট। আরও কত কিছুই না করছে এই আধুনিক যুগে, নিত্যনতুন সরঞ্জাম আবিষ্কারের মাধ্যমে। তাই না? কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আমরা অন্য গ্রহে চলে গেলেও আমাদের নিজেদের গ্রহে থাকা সমুদ্রের তলদেশ সম্পর্কে ৮০ শতাংশই অজানা।
পৃথিবীতে যত মহাসাগর আছে তার তলদেশে এখনো মানুষ পৌঁছাতেই পারেনি। এমনকি কোনো আধুনিক যন্ত্রও পাঠানো সম্ভব হয়নি সমুদ্রের তলদেশের প্রায় আশি শতাংশে।
সমুদ্রে প্রায় ২০ লাখ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ রয়েছে, যার মধ্যে বিজ্ঞানীরা কেবল ২ লাখ ২৮-৩০ হাজার প্রজাতি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। এরই মধ্যে মাছ প্রজাতি রয়েছে ৩০-৪০ হাজার। কোনোটা নিরীহ তো কোনোটা ভয়ংকর, কোনোটা নজরকাড়া তো কোনোটা রহস্যময়; নীল প্যারটফিশ-ও তেমনি একটি অদ্ভুত মাছ। তুমি বিস্ময়কর এই মাছকে দেখলে নিশ্চিত টিয়া ভেবে বসবে।
নামকরণ
অদ্ভুত এই মাছটির নাম-নীল প্যারটফিশ।
টিয়াপাখির মতো সবুজ রঙের না হলেও এর রঙ পরিপূর্ণ নীল। মুখ ও ঠোঁট টিয়াপাখির অবিকল হওয়ায় এই মাছের নামকরণ করা হয়েছে, নীল প্যারটফিশ। এর বৈজ্ঞানিক নাম, Scarus coeruleus.. নীল প্যারটফিশের বৈজ্ঞানিক নাম লাতিন ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ, নীল মাছ। প্যারটফিশ পরিবারের (Scaridae) মধ্যে, প্রায় ৯৫টি প্রজাতি রয়েছে। নীল প্যারটফিশ তাদের মধ্যে একটি।
আকার-আকৃতি
প্যারটফিশ নীল রঙের হয়। মাথায় একটি হলুদ দাগ থাকে, যা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মøান হয়ে যায়। এদের গড় দৈর্ঘ্য ৩০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার (১২ থেকে ৩০ ইঞ্চি) এবং সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ১.২ মিটার (৩ ফুট ১১ ইঞ্চি)। অন্য কোনো প্রজাতির এমন নীল রঙ থাকে না। এদের ওজন প্রায় ৯.১ কিলোগ্রাম (২০ পাউন্ড)। এদের দাঁত একত্রে মিশে থাকে এবং ওপরের চোয়ালটি নিচের চোয়ালের ওপর দিয়ে ঢেকে যায়। যার ফলে ঠোঁটের মতো আকৃতির মুখের গঠন তৈরি হয়, যা দেখতে অবিকল টিয়াপাখির মুখের মতো দেখায়। শক্ত চোয়াল ও দাঁতসহ ঠোঁট পাথর এবং প্রবাল থেকে শৈবাল ছিঁড়ে ফেলার জন্য ব্যবহৃত হয়।
খাদ্য
নীল প্যারটফিশ দলবেঁধে খাবার সন্ধানে বের হয়। এরা সাধারণত ৫০০ জনের একটি দলে খাদ্য সংগ্রহ করে। এরা দলবদ্ধ হয়েই ডিম ছাড়ে এবং শিকারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এদের খাদ্যাভ্যাস হলো শৈবালের মধ্যে থাকা ক্ষুদ্রকায় জীব খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
নীল প্যারটফিশের জন্য সর্বোত্তম খাদ্য বিকল্প হলো, সমুদ্রের পাথর এবং প্রবালে পাওয়া প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন শৈবাল। বিশেষ ধরনের ছোট ছোট গাছ এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র জীবও খায়। এদের জীবনের ৮০ শতাংশ সময় ব্যয় করে খাদ্যের সন্ধানে।
গলবিল দাঁত
নীল প্যারটফিশের গলাতেও দাঁত থাকে, যাকে বলা হয় ‘ফ্যারিঞ্জিয়াল অ্যাপারেটাস’ বা গলবিল দাঁত। যা দ্বারা এরা পাথরকে বালিতে পিষে ক্ষুদ্র জীবকে খাওয়া এবং ছাঁকনি হিসেবে ব্যবহার করে।
বাসস্থান
প্যারটফিশ লবণাক্ত জলের মাছ, যা পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগরের ৩-২৫ মিটার গভীরতায়, মেক্সিকো উপসাগরের দক্ষিণ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। ক্যারিবিয়ান সাগরের গ্রীষ্মম-লীয় এবং উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চলের সাগরেও পাওয়া যায় প্যারটফিশ। এ ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড, বারমুডা, বাহামা এবং দক্ষিণে ব্রাজিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জুড়েও এদের পাওয়া যায়। এরা প্রবাল প্রাচীর এবং ৮০ ফুট গভীরতার অগভীর উপকূলীয় জলে বাস করতে পছন্দ করে এবং বারমুডা, বাহামা, জ্যামাইকা এবং হাইতির স্থানীয় বাসিন্দা। এই মাছগুলো কেবল প্রবাল প্রাচীরের স্বাস্থ্যের জন্যই নয়, ক্যারিবিয়ান সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যেও অবদান রাখে।
নীল প্যারটফিশ ৩-২৫ মিটার গভীর প্রবাল প্রাচীরে বাস করে। ছোট অবস্থায় সাধারণত থ্যালাসিয়া টেস্টুডিয়াম বেডে তথা, কচ্ছপ ঘাসে পাওয়া যায়। এরা প্রতি সেকেন্ডে তাদের মোট দৈর্ঘ্যরে ৩.২ গুণ গতিতে চলাচল করতে পারে।
প্রজনন
নীল প্যারটফিশ সারা বছর ধরে প্রজনন করে কিন্তু জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত গ্রীষ্মের মাসগুলোতে মিলনের সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে এবং সাধারণত সন্ধ্যায় ডিম পাড়ে। পুরুষ এবং মহিলা উভয়ই দুই থেকে চার বছর বয়সের মধ্যে পরিপক্বতায় পৌঁছায়। স্ত্রী মাছ পানিতে নিষিক্ত ডিম পাড়ার ২৫ ঘণ্টার পর তা ফুটে ওঠে। ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার মাত্র তিন দিন পর এরা ঘাস এবং ছোট জীব খাওয়া শুরু করে।
জীবনকাল
নীল প্যারটফিশ তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ৭ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার আশা করা যেতে পারে। তবে বন্দি বা অ্যাকোয়ারিয়ামে রাখলে তাদের জীবনকাল অনেক কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কারণ, সাধারণত বন্দি পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়ে।