২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া ভারতীয় চলচ্চিত্র ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ উত্তর ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের ওয়াসিপুর শহরকে কেন্দ্র করে নির্মিত। এই এলাকায় গ্যাং গঠন, দিনে-দুপুরে খুনাখুনি, সংঘর্ষ, রাজনৈতিক প্রভাব, আধিপত্য, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদকসহ নানা অপরাধের সমন্বয় দেখানো হয়েছে। গত এক বছরে ঢাকার মোহাম্মদপুরের চিত্র অনেকটা সেই চলচ্চিত্রের মতো। রাজধানীর জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকাটি ‘ওয়াসিপুরের’ মতোই অপরাধের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ওয়াসিপুরের মতো মোহাম্মদপুরেও দিনে-দুপুরে ছিনতাই, অস্ত্রের মহড়া, দফায় দফায় সংঘর্ষ, গোলাগুলি, খুন-হত্যা, মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে জড়িত।
গত এক বছরে এখানে কুপিয়ে ও গুলি করে ৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। কয়েকটি গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষ, ককটেল নিক্ষেপ ও অস্ত্রের মহড়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, গ্রেপ্তার ও টহল অব্যাহত থাকলেও অপরাধ কমছে না। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) প্রতিদিন মোহাম্মদপুর থেকে গড়ে ১০ থেকে ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্ত হয়ে তারা আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্রুত মোহাম্মদপুরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, মোহাম্মদপুর এখন একটি আলোচিত অপরাধপ্রবণ এলাকা। বিগত সরকারের সময় যেমন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পরও তা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে মোহাম্মদপুরের চারটি হটস্পট বসিলা বেড়িবাঁধ, ঢাকা উদ্যান, জেনেভা ক্যাম্প ও টাউন হলের বিপরীত পাশের বিহারি ক্যাম্প কেন্দ্র করে মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী, চোর-ডাকাতসহ বিভিন্ন অপরাধী সক্রিয়। চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতির ভয়ে স্থানীয়রা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। এখানে ব্যবসা করা কঠিন। সন্ধ্যা নামতেই এলাকার আবাসিক ভবন ও সড়কগুলো থমথমে হয়ে যায়। কখন, কোথায়, কে অপরাধের শিকার হবেন তা কেউ অনুমান করতে পারেন না।
খুনের স্বর্গ রাজ্য : গত ১১ আগস্ট মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে আধিপত্য ও মাদক কারবার নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। নতুন একটি হেরোইন স্পট বসানোকে কেন্দ্র করে শাহ আলম (২২) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এখানে কুপিয়ে বা গুলি করে হত্যা নতুন কিছু নয়। এর আগে গত ১ মে দুই গ্রুপের সশস্ত্র হামলায় মাহতাব হোসেন (৩২) নামে এক মাছ ব্যবসায়ী নিহত হন। গত বছর ২৮ অক্টোবর মো. রহমত ওরফে সার্জেন্ট (১৩) নামে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।
মোহাম্মদপুর অপরাধপ্রবণ হওয়ার পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা ও অদক্ষতাকে দায়ী করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, ‘এই এলাকাটি অপরাধপ্রবণ হওয়ার পেছনে তিনটি উপাদান রয়েছে। প্রথমত, এখানে বিহারিদের বসবাস এবং তাদের দিয়ে বিভিন্ন অপরাধ করানো। দ্বিতীয়ত, মোহাম্মদপুর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল, যেখানে তুলনামূলক কম খরচে জীবনযাপন সম্ভব। এ সুযোগে অপরাধীরা এখানে বেশি বসবাস করে এবং অপরাধ সংঘটিত করে। তৃতীয়ত, অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা নিজেরাই তাদের আশ্রয়দাতা হয়ে ওঠেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম বিশেষ অভিযানে মোহাম্মদপুরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু তা হয়নি, কারণ এই অভিযান রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালিত হচ্ছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এলাকাভিত্তিক বিশেষ অভিযান চালাতে হবে, যার লক্ষ্য শুধুই অপরাধীদের দমন হবে। জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এমন অপরাধগুলো। অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিলে মোহাম্মদপুরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।’
মোহাম্মাদপুরে ছোট থেকে বড় সবাই যেন গ্যাংয়ের সদস্য। কিশোর, তরুণ ও যুবকরা বুঝে ওঠার আগেই মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ে। দেশীয় অস্ত্র সহজেই তাদের হাতে চলে আসে। ফলে মোহাম্মদপুর ‘ক্রাইম হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে। অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হওয়ায় এখানকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বদলে যাচ্ছে। সন্ধ্যা নামতেই সড়কগুলো থমথমে হয়ে যায়। কখন, কোথায়, কীভাবে অপরাধের শিকার হবেন, তা কেউ অনুমান করতে পারেন না। ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা, চাঁদাবাজিতে স্থানীয়রা অস্থির। অনেকে মোহাম্মদপুর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
পাহাড় সমান মামলা থাকলেও সহজেই জামিন : অপরাধীদের আটক করতে মোহাম্মদপুরে প্রতিনিয়ত যৌথ বাহিনীর অভিযান চালানো হয়। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন অপরাধী গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু তাতেও অপরাধ কমছে না। গ্রেপ্তারের পর সহজেই জামিনে মুক্ত হয়ে তারা আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ‘কবজি কাটা’ গ্রুপের প্রধান আনোয়ারকে গত তিন মাস আগে গ্রেপ্তার করা হয়। তার নামে প্রায় ২০টির বেশি মামলা রয়েছে। তবুও সম্প্রতি একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তত্ত্বাবধানে জামিনে মুক্তি পায় আনোয়ার। পরে তাকে আবার ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়। শুধু আনোয়ার নয়, মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তারকৃতদের নামে ২০ থেকে ৩০টি করে মামলা রয়েছে। তবুও তারা সহজেই জামিনে মুক্ত হয়ে মাদক কারবার ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যায়। একাধিক আইনজীবী বলেন, সিআরপিসির যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় অপরাধীরা সহজেই জামিন পেয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
হেরোইনের নতুন স্পট ঘিরে হত্যাকাণ্ড : মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে শুরু থেকেই মাদকবাণিজ্য বিস্তার লাভ করেছে। মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পে কয়েকটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। গাঁজা, হেরোইন ও ইয়াবা এই ক্যাম্পে প্রকাশ্যে বেচাকেনা হয়। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে নিয়মিত সংঘর্ষ হয়। জেনেভা ক্যাম্পের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ১৬ বছর ধরে এখানে ‘ভূঁইয়া সোহেল’ ওরফে ‘বুনিয়া সোহেল’ গ্রুপ একক আধিপত্য বজায় রেখেছিল। তবে গত বছর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি-সমর্থিত ‘সেলিম আশরাফি’ ওরফে ‘চুয়া সেলিম’ গ্রুপ আধিপত্য জানান দিতে সংঘর্ষে জড়ায়। তারা গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা আরও জানান, দুই মাস আগে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর বুনিয়া সোহেল ও চুয়া সেলিম গ্রুপের সদস্যরা আবার সক্রিয় হয়। ক্যাম্পের উত্তর-পূর্ব কর্নারে বুনিয়া সোহেলের দুটি হেরোইন স্পট ছিল। কিন্তু গত দুই মাসে বাবর রোডের ‘ময়লার গলি’তে চুয়া সেলিম গ্রুপের সদস্য গাল কাটা মনু, ইমতিয়াজ ও শাহ আলম নতুন একটি হেরোইন স্পট বসায়। এতে পুরনো গ্রাহক হারিয়ে ক্ষিপ্ত হয় বুনিয়া সোহেল ও তার গ্রুপ। গত ৮ আগস্ট সকালে বুনিয়া সোহেল নিজে নতুন স্পটে গিয়ে মাদক বিক্রি বন্ধের চেষ্টা করে, যা থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়। সেদিন ককটেল বিস্ফোরণও ঘটে। দুদিন ধরে দফায় দফায় সংঘর্ষের জেরে ১১ আগস্ট দুপুরে শাহ আলমকে হত্যা করা হয়।
ছিনতাই-ডাকাতির হটস্পট : মোহাম্মদপুরে ছিনতাইয়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে কিছু এলাকাকে তীব্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদ উদ্যান, সাত মসজিদ হাউজিং, লাউতলা, নবীনগর হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, তুরাগ হাউজিং, বসিলা ৪০ ফিট, কাটাসুর, গ্রিন হাউজিং, বসিলা গার্ডেন সিটি, একতা হাউজিং, চাঁন মিয়া হাউজিং, মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড, মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি, নবোদয় হাউজিং, বোটঘাট, সাদেক খান রোড, ক্যান্সার গলি, রায়েরবাজার, পুলপাড় বটতলা, শেরেবাংলা রোডে সবচেয়ে বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।
মোহাম্মদপুরে অন্যান্য আলোচিত ঘটনা : স্থানীয়রা বলছেন, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর মোহাম্মদপুরে বহু অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কিছু ঘটনা সবার নজর কেড়েছে। যেমন নেসলে কোম্পানির গাড়ি থেকে ১১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ছিনতাই, অস্ত্রের মুখে নারী শিক্ষার্থীর ব্যাগ কেড়ে নেওয়া, সাদেক খান আড়তের সামনে দুজনকে কুপিয়ে হত্যা, একতা হাউজিংয়ে ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় নিরাপত্তাকর্মীকে কুপিয়ে হত্যা, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য একের পর এক হত্যাকাণ্ড, জেনেভা ক্যাম্পে গোলাগুলি ইত্যাদি।
এসব ঘটনায় পুলিশ ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা, উদাসীনতা ও অদক্ষতার কথা উল্লেখ করেন স্থানীয়রা। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করছেন এবং দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
বিশেষ অপরাধপ্রবণ এলাকার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা মনে করেন, বিশেষ অপরাধপ্রবণ এলাকার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রতিটি শহর বা জেলায় কিছু অপরাধপ্রবণ এলাকা থাকে, যেগুলো ‘ক্রাইম হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এসব এলাকায় অন্য এলাকার মতো অপরাধ প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এখানে প্রয়োজন বেশি টহল, এলাকাবাসীর সঙ্গে মতবিনিময় করে সচেতনতা তৈরি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে অপরাধীদের তালিকা তৈরি ও নিয়মিত ফলোআপ। এ ছাড়া সিসি ক্যামেরা ও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তবে মোহাম্মদপুরের মতো অতিমাত্রায় অপরাধপ্রবণ এলাকার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পুলিশের বিশেষ একটি দল, যারা এলাকার অপরাধীদের সম্পর্কে আদ্যোপান্ত অবগত থাকবে। রাজনীতিবিদ ও ছাত্র-জনতাকেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, ঐতিহ্যগতভাবে মোহাম্মদপুরে অন্য এলাকার তুলনায় অপরাধীদের বিচরণ বেশি। এখানে উর্দু ভাষাভাষীদের দুটি ক্যাম্প রয়েছে। এ ছাড়া বাস, লেগুনা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড রয়েছে। এসব জায়গায় ভাসমান জনগোষ্ঠীর বিচরণ বেশি। মোহাম্মদপুরে অপরাধ করে তারা গাবতলী বা মিরপুরে চলে যায়। ঢাকা উদ্যানের পাশে তুরাগ নদী অপরাধীদের নিরাপদে পালানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অপরাধীরা প্রায়ই কেরানীগঞ্জ বা আশপাশের এলাকায় অবস্থান করে। সুযোগ পেলে নদীপথে মোহাম্মদপুরে এসে অপরাধ সংঘটিত করে আবার নিরাপদে চলে যায়। এসব সুযোগের কারণে মোহাম্মদপুরে অপরাধ বেশি হয়। তবে নিয়মিত পুলিশি টহল, অভিযান ও বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।