‘আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে-খাওয়ার অভাবে’

রাজশাহীর পবা উপজেলার বামনশিকড় গ্রামে একটি পরিবারের চার সদস্যের জীবনের আলো নিভে গেছে। গতকাল শুক্রবার সকালে একটি বাড়ির দুটি কক্ষ থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে চারজনের পরিবারের মরদেহ। দিনমজুর মিনারুল ইসলাম (৩৬), তার স্ত্রী মনিরা খাতুন (৩২), ছেলে মাহিম (১১), এবং দেড় বছরের শিশুকন্যা মিথিলার মৃত্যুতে পুরো গ্রাম শোকে স্তব্ধ।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মিনারুল তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর নিজেও গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা একটি চিরকুটে এই হৃদয়বিদারক ঘটনার কারণ উঠে এসেছে ঋণের বোঝা আর খাদ্যের অভাবে জর্জরিত জীবনের কাছে হার মানার কথা। 

পুলিশ ও সংশ্লিষ্টরা বলছে, মিনারুলের হাতে লেখা চিরকুটটি পড়লে বোঝা যায়, কী নিদারুণ কষ্ট তাকে এই চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মিরারুল লিখেছেন, ‘আমি মিনারুল, নিজের কথা লিখে যাচ্ছি। আমরা চারজন আজ রাতে মারা যাব। এই মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি প্রথমে আমার স্ত্রীকে, তারপর ছেলে মাহিমকে, তারপর মেয়ে মিথিলাকে হত্যা করেছি। এরপর নিজে গলায় ফাঁস দিয়েছি। আমি নিজ হাতে সবাইকে মেরেছি, কারণ আমি একা মরলে আমার স্ত্রী-সন্তানরা কার আশায় বেঁচে থাকবে? কষ্ট আর দুঃখ ছাড়া তাদের জন্য কিছুই থাকবে না। আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে। এত কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না। বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো। আর কারও কাছে হাত পাততে হবে না। আমার জন্য কাউকে মানুষের কাছে ছোট হতে হবে না। আমার বাবা আমার জন্য অনেকবার ছোট হয়েছেন, আর নয়। চিরদিনের জন্য চলে গেলাম।’

চিরকুটে তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমাদের চারজনের মরা মুখ যেন আমার বাবার বড় ছেলে ও তার পরিবার না দেখে। তারা যেন জানাজায় না আসে।

আমাদের কাফনের খরচ যেন আমার বাবা না দেন। এটা আমার কসম।’

এই কথাগুলো মিনারুলের হাতের লেখা কি না, তা নিশ্চিত করতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। তবে প্রাথমিকভাবে পুলিশ বলছে, লেখাটি মিনারুলেরই।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকালে মিনারুল ও তার পরিবারের কেউ ঘর থেকে বের না হওয়ায় আত্মীয়রা ডাকাডাকি করেন। কোনো সাড়া না পেয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে তারা দেখতে পান মিনারুলের ঝুলন্ত মরদেহ। খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখে, একটি কক্ষে মিনারুলের মরদেহ ঝুলছে। পাশের বিছানায় পড়ে আছে ছেলে মাহিমের নিথর দেহ। অন্য কক্ষে ছিল স্ত্রী মনিরা ও শিশু মিথিলার মরদেহ। পুলিশ চিরকুটটি মিনারুলের মরদেহের পাশ থেকে উদ্ধার করে।

মতিহার থানা-পুলিশ মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে সিআইডি ও পিবিআই।

স্থানীয়রা জানান, মিনারুল ও তার বাবা-মা একই বাড়িতে থাকলেও তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল কম। মিনারুল কখনো ভ্যান চালাতেন, কখনো কৃষিকাজ করতেন। কিন্তু জুয়া খেলা ও নেশার আসক্তির কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। একাধিক এনজিও ও ব্যক্তিগতভাবে ধার নেওয়া টাকার কিস্তি পরিশোধ করতে তিনি হিমশিম খাচ্ছিলেন।

মিনারুলের বাবা রুস্তম আলী জানান, সাত-আট বছর আগে ছেলের ঋণ পরিশোধের জন্য তিনি জমি বিক্রি করেছিলেন। প্রায় দেড় লাখ টাকার ঋণ তখন শোধ করা হলেও মিনারুল পরে  আরও ঋণ করেছিলেন কি না, তা তিনি জানেন না। গতকাল সকালে ডাকাডাকিতে সাড়া না পেয়ে মই দিয়ে ঘরে উঠে তিনি ছেলের ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান।

মিনারুলের শাশুড়ি আনসুরা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ের সঙ্গে মিনারুলের কোনো কলহ ছিল না। তারা পরিবার নিয়ে ভালোই ছিল।’

কিন্তু স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে, জুয়া খেলার আসক্তি মিনারুলকে ঋণের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। পারিলা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সুজন কবির বলেন, ‘মিনারুলকে প্রতি সপ্তাহে কিস্তি দিতে হতো। জুয়া খেলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সে ঋণের ফাঁদে আটকে যায়।’

ইউপি চেয়ারম্যান সাঈদ আলী মোর্শেদ জানান, তিন দিন আগেও মিনারুল তার কাছে গিয়ে বলেছিলেন, বাড়িতে খাবার নেই। তিনি তাকে কিছু টাকা দিয়েছিলেন। চেয়ারম্যান বলেন, ‘শুনেছি, মিনারুল আগে তাস খেলত। পরে সে বন্ধ করেছিল। তার বাবা আগেও জমি বিক্রি করে ঋণ শোধ করেছিলেন।’

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, মিনারুল তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেছেন। তবে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। চিরকুটের হস্তাক্ষর তার কি না, তাও যাচাই করা হবে।’ 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিনারুলের এই চরম সিদ্ধান্ত শুধু তার পরিবারের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য একটি তীব্র সতর্কবার্তা। ঋণের বোঝা, দারিদ্র্য, আর সামাজিক চাপ কীভাবে একটি মানুষকে এমন নির্মম পথে নিয়ে যেতে পারে, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট।