‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’ নাম নিয়ে ফিরছেন পোষ্যরা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নাম্বার ২৬.৪ পেলেই ভর্তি হতে পারতেন পোষ্য কোটাধারীরা। প্রতি বিভাগে সর্বোচ্চ চারজন করে ১৪৮ জনের ভর্তির সুযোগ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাধিক সন্তান, স্ত্রী ও ভাইবোন এ সুবিধা পেতেন। সর্বশেষ পাঁচ বছরে এসব সুবিধায় আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হয়েছে। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল পোষ্য কোটা বাতিল ঘোষণা করেছিলেন। তবে প্রথম বর্ষের ভর্তি কার্যক্রমের শেষ পর্যায়ে এসে পোষ্য কোটাকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’ নাম দিয়ে পুনরায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত বুধবার রাতে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরিচালনা কমিটির এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর কোটাবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী সরকারের পতনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ভিসি কোটা বাতিল এবং মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও পোষ্য কোটা সংস্কারের দাবি তোলেন শিক্ষার্থীরা। গত বছর ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভিসি কোটা বাতিল ও মুক্তিযোদ্ধা সংস্কার করলেও পোষ্য কোটার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। পরে চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে পোষ্য কোটায় ভর্তির ক্ষেত্রে নতুন সিদ্ধান্ত জানান উপাচার্য। সে সময় উপাচার্য নতুন যে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন, সেগুলো হলো পোষ্য কোটায় মোট ৪০টি আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে এবং শুধু সন্তানের ক্ষেত্রে এ সুবিধা পাবেন সংশ্লিষ্টরা। পোষ্য কোটাধারীদের সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ পাসমার্ক থাকতে হবে। এ ঘটনার পরদিন সংস্কারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরপর শিক্ষার্থীরাও পোষ্য কোটা পুরোপুরি বাতিলের দাবিতে প্রশাসনিক ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। একপর্যায়ে উপাচার্য পোষ্য কোটা সম্পূর্ণরূপে বাতিল ঘোষণা করেন।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, উপাচার্য পোষ্য কোটা বাতিল ঘোষণার পর আবার সেটা ভিন্ন নামে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তবে প্রশাসন বলছে, পোষ্য কোটা সম্পূর্ণরূপে ফিরিয়ে আনা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক-কর্মকর্তা- কর্মচারীদের যে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা রয়েছে, সেটার আওতায় তাদের সন্তানদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। পোষ্য ভর্তির ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগ পর্যালোচনা করে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনায় নিয়ে পোষ্য ভর্তির নিয়ম সংস্কারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরিচালনা কমিটি নীতিগতভাবে একমত পোষণ করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার রাতে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সব অনুষদের ডিনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় পোষ্য ভর্তিতে আগের নিয়মগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় সংস্কার করে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর শুধু একজন সন্তান পোষ্য হিসেবে ভর্তির সুযোগ পাবে। প্রতিটি বিভাগে সর্বোচ্চ চারজন ভর্তি হতে পারবে। তবে সর্বমোট ৪০ জনের বেশি ভর্তি করা যাবে না। পোষ্য ভর্তির ক্ষেত্রে ন্যূনতম পাস নাম্বার ৪০ শতাংশ (লিখিত ৮০ নম্বরের মধ্যে) থাকতে হবে এবং কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সন্তানকে তার কর্মরত বিভাগে পোষ্য হিসেবে ভর্তি করতে পারবেন না।

এ বিষয়ে পোষ্য কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ জাবি শাখার আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, পোষ্য ভর্তি নিয়ে আমরা সত্যিই মর্মাহত। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাতিল হওয়া পোষ্য ভর্তি ফের চালু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। অবিলম্বে প্রশাসনকে শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে যৌক্তিক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

পোষ্য কোটার জটিলতায় প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরুতেও দেরি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের (৫৪তম ব্যাচ) ভর্তি পরীক্ষা গত ৯ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়, যা শেষ হয়েছিল ১৭ ফেব্রুয়ারি। অন্যান্য কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার ছয় মাস পরেও ক্লাস শুরু করতে পারেনি। পোষ্য কোটার হিসাব-নিকাশে ভর্তি কার্যক্রম পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী এখনো ৬১টি আসন শূন্য রয়েছে। ফলে ভর্তির শুরুতেই অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছেন নবীন শিক্ষার্থীরা।

এ বিষয়ে জানতে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসানের কার্যালয়ে গেলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে জানান তার ব্যক্তিগত সহকারী। মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

তবে গত শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞাপ্তিতে বলা হয়, কেন্দ্রীয় ভর্তি পরিচালনা কমিটির সভায় পোষ্য ভর্তির ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পোষ্য ভর্তির নিয়ম সংস্কারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরিচালনা কমিটি নীতিগতভাবে একমত পোষণ করে।  একই সঙ্গে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ থেকে পোষ্য ভর্তির বিষয়টি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট পর্ষদে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে শর্ত মেনে পোষ্যদের ভর্তি হতে হবে।