নিজভূমে পরবাসী ১২০ ভারতীয়

কয়েক দিন পরপরই বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতীয়দের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে। অস্ত্রের মুখে ঝোপঝাড়-জঙ্গল পেরিয়ে এ দেশে ঢুকছে। অনেকে বুঝতেই পারে না তারা বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। হেনস্তার শিকার ভিনদেশিরা তাদের দুর্দশার কাহিনি স্থানীয়দের জানায়। উ™£ান্তের মতো ঘুরে বেড়ানোর সময় তারা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নজরে পড়ে। নিজভূমে পরবাসী এসব ভারতীয়কে স্থানীয় জনতাই আবার পুশব্যাক করে।

গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ঠেলে দেওয়া ১২০ ভারতীয় নাগরিককে সীমান্ত থেকেই ফেরত পাঠানো হয়েছে। তারা ভারতের আসাম, মুড়িগাও, গোলাঘাট, কামরূপ, থুবড়ি, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, হাবড়া, চব্বিশ পরগনা ও কলকাতার আধারকার্ডধারী বাসিন্দা। এসব ভারতীয়কে ফেরত পাঠানো প্রসঙ্গে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, অন্য দেশের নাগরিকদের পুশইনের নামে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এমন আচরণ মেনে নেবে না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খন্দকার মো. মাহবুবুর রহমান (রাজনীতি ও আইসিটি) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ করা হবে। আমাদের সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কোনোভাবেই অন্য দেশের নাগরিককে বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকতে দেওয়া হবে না। যাচাই-বাছাই করে যাদের ভারতীয় কাগজপত্র রয়েছে, তাদের সীমান্ত থেকেই ফেরত দেওয়া হচ্ছে। ১২০ জনের নাম-পরিচয় প্রকাশ হলেও সংখ্যাটি আরও বেশি।’

তিনি আরও বলেন, ‘মুসলমান, বাংলা ভাষাভাষী ভারতীয় ছাড়াও সে দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদেরও বাংলাদেশে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা কোনোভাবেই মানা হবে না।’ বাংলাদেশি নাগরিকদের সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘দেশের নাগরিকদের উচিত হবে না অন্য দেশে অবৈধ হয়ে যাওয়া। এতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়।’

গত ৩০ মে লালমনিরহাট জেলার বুড়িমারী রেলস্টেশন এলাকায় নিজাম আহমেদসহ পাঁচজন ভারতীয় নাগরিককে সন্দেহজনক অবস্থায় পাওয়া যায়। স্থানীয়দের তারা জানিয়েছেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা গভীর রাতে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। নিজাম আহমেদ আরও জানান, তিনি আসামের বাসিন্দা এবং তার বাবা ছিলেন আসাম পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্য। ৪৮ বছর বয়সী নিজাম আহমেদ ভারতের আসাম রাজ্যের কামরূপ জেলার কামালপুর থানার অন্তর্গত মাজুলি গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম সেলিমউদ্দিন আহমেদ, যিনি ২ নম্বর আসাম পুলিশ ব্যাটালিয়নে কনস্টেবল পদে কর্মরত ছিলেন। সেলিমউদ্দিন আহমেদ ১৯৬৮ সালের ৯ মার্চ ১৯ বছর বয়সে পুলিশের চাকরিতে নিয়োগ পান। তিনি কামরূপ জেলার দমরিচোকী পোস্ট অফিস এলাকার বাসিন্দা ছিলেন এবং গুয়াহাটি ছিল তার নিকটবর্তী টেলিগ্রাফ ও রেলস্টেশন। নিজাম ভারতে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত নন। তার সঙ্গে তখনো তার বাবার চাকরির পরিচয়পত্র ছিল। লালমনিরহাটের মতো কুড়িগ্রাম ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বেশি পুশইনের ঘটনা ঘটছে।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বনচৌকি সীমান্তে ৭৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের পাগলিমারী ক্যাম্পের সদস্যরা ছয়জন নারী-পুরুষকে বাংলাদেশে অবৈধভাবে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। বিজিবি এবং স্থানীয়দের তৎপরতায় সেই পুশইন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন মিছমা খাতুন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, মিছমা বিজিবি সদস্যদের অনুরোধ করছেন যাতে বিএসএফ সদস্যরা তাদের ওপর নির্দয় আচরণ না করেন। ভিডিওতে তিনি জানান, তার কাছে ভারতীয় আধার কার্ড, প্যান কার্ড এবং ভোটার আইডি রয়েছে। মিছমা খাতুনের ছেলে আবদুল সুবান অভিযোগ করেছেন, গত ২৪ মে হোজাই থানা পুলিশ তার মাকে একটি ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ মামলার তদন্তের জন্য তুলে নিয়ে যায়। পরে সামাজিকমাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, মাকে বাংলাদেশে পুশ করা হয়েছিল এবং পুনরায় তাকে ভারতের ভেতরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপর থেকে মাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মিছমা খাতুনের বাড়ি আসামের হোজাই জেলার লংকাজান দর্জিশিট গ্রামে।

স্থানীয় জনতা যাদের ফেরত পাঠিয়েছে তাদের সবার কাছেই আধার কার্ড ছিল। আধার কার্ড হলো ভারতীয় সরকারের দেওয়া নাগরিকদের পরিচিতি পত্র। ১২ ডিজিটের আইডি নম্বর ব্যবহার করে তৈরি করা এ কার্ড ভারতীয় নাগরিকের জন্য একটি আবশ্যক দলিল। এটি সরকারি বিভাগ ও সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যবহৃত হয়। আধার কার্ডে নাম, পিতার নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ এবং জেন্ডারসহ ব্যক্তিগত তথ্য থাকে। এ ছাড়া এটি পাসপোর্ট এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য প্রমাণপত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আধার কার্ড না থাকলে ভারতে পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্স করা যায় না।

সীমান্ত থেকে ভারতীয়দের ফেরত পাঠানো প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাহেদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ নিজস্ব সত্তার বিকাশ ঘটাতে চাচ্ছে, তাই ভারত নাখোশ হয়ে ভারতীয় বাংলাভাষীদের ঠেলে দিচ্ছে। এটি মূলত রাজনৈতিক কারণে। তাদের পছন্দের সরকার ক্ষমতায় নেই বলে বাংলাদেশকে চাপে ফেলতে চাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে, পুশইনের নামে ভারতীয়দের আন্তর্জাতিক আইন অমান্যের জবাব দিচ্ছে। ভারত পেশিশক্তি দেখাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্তে পুশব্যাক বা পুশইন আসলে এমন একটা পদ্ধতি, যেখানে ধরা পড়া ব্যক্তিদের সীমান্তে নিয়ে গিয়ে অন্য দেশের সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়ার কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই বিশ্বে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এ পদ্ধতি চলে আসছে, যেটা আনুষ্ঠানিকভাবে কেউই স্বীকার করে না। বিদেশ থেকে কেউ যদি পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া ভারতে প্রবেশ করেন, তাহলে পদ্ধতি হলো তাকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা এবং ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা। ভারতের বিদেশি আইনের ১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী মামলা হবে। মামলায় যদি সেই ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার সাজা হবে। সাজা খাটার পর আদালতের মাধ্যমেই সেই ব্যক্তি যে দেশ থেকে এসেছেন, সেখানে ফেরত পাঠানো হবে।’

গত ৩ আগস্ট কলকাতায় নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন দিলীপ কুমার সাহা। ৬৩ বছর বয়সী দিলীপ সাহা দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়ার একটি স্কুলে কাজ করতেন। টেলিগ্রাফ ও এনডিটিভিসহ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, ভারতীয় নাগরিক ‘বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে’ এ আতঙ্কে আত্মহত্যা করেছেন তিনি। তার ঘর থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনসের (এনআরসি) কার্যক্রম ও দেশছাড়ার ভয়ের কথা বলেছেন দিলীপ।

দিলীপ কুমারের মতো এমন অসংখ্য বাংলাভাষী নাগরিককে প্রতিনিয়তই বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হবে এ আতঙ্কে আছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষীদের ওপর নির্যাতন হচ্ছে, নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র এবং ওড়িশা রাজ্যে কয়েক মাস ধরে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সন্দেহে বহু বাংলাভাষীকে আটক করা হচ্ছে, যারা আসলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান বাসিন্দা। মমতার এ ধরনের বক্তব্য পশ্চিমবঙ্গের গণমাধ্যমগুলোতে নিয়মিত প্রচার হচ্ছে।

বিজিবি সূত্রে জানা যায়, ফেরত পাঠানো ১২০ ভারতীয়রা হলেন জয়নাল আবেদীন (৫৫), মো. খাইরুল ইসলাম (৫২), উফা আলী (৭৫), আবদুল লতিফ (৫৫), নুর ইসলাম (৪৩), আবুল খায়ের (৪২), ওসমান আলী (৬৫), গুলজার হোসেন (৫৫), হাফিজ উদ্দিন (৮৩), ছাহেরা খাতুন (৪৭), জাহানারা বেগম (৫৫), আছিয়া খাতুন (৫৫), হাজেরা খাতুন (৬০), সোনা বানু (৫০), সদর আলী (৭০), মাজেদা খাতুন (৫০), আবুল আলী (৬৫), নাসিমা বেগম (৪৯), কুরজান বেগম (৪২), জমিলা বিবি (৪৫), নুরজাহান বিবি (৫০), জমিরাত আলী (৭০), মালিকা বেগম (৫৫), আহসান আলী (৭৪), কাশেম আলী (৪৫), রহিমা বেগম (৫০), হালিমা বেগম (৪৪), আসিব আলী (৬০), দোলেয়ারা খাতুন (৫০), আবুল আলী (৩৩), মুক্তার আলী (৬৫), রুস্তম আলী (৬৫), মো. আবু বক্কর সিদ্দিক (৬৫), মিস আছিয়া খাতুন (৫০), মো আনোয়ার খান, সাইফুল ইসলাম (৩৫), ইসমাইল আলী (৪৮), মোছা. আম্বিয়া খাতুন (৩৫), মো. আবদুল হালিম (৪৫), আ. আলী (৫০), মো. হাবিবুর হোসেন (২৫), মোছা. ফাতেমা বেগম (৪৫), নসিমুদ্দিন (৫০), সোনালী শেখ (৪৫), জরিনা বিবি (৪৬), আকলিমা বেগম (৩৫), মো. সমর আলী, আবদুল হানিফ (৪১), হাসিনুর (৩৮), মো. শাহ আল (২৮), মো. আইয়ুব আলী (৫৫), তাহের আলী (৪৫), মো. আইন উদ্দিন, ইদ্রিস আল, নিজাম আহমেদ (৪৮), আবদুল গফুর (৫৬), কিসমত আলী (৬৩), মোসা. হাফিজা বেগম (৩৫), মো. রহমত আলী (৭০), নুরেজা বেগম (৪৫), মো. ইসমাইল হোসেন (৫০), মো. মোস্তফা কামাল শেখ (৬৩), মো. মিনারুল শেখ (৩৪), মো. নাজিম উদ্দিন (৩৪), মো. আজিজুল আলী ম-ল (৩১), ইয়ানুর আলী ম-ল (০৪), ফাতেমা খাতুন (০৭), মো. আমানুল্লাহ (৫৭), মো. সেকেন্ড আলী (৬০), মো. শোহরব আলী (৪৮), মো. মজিবর শেখ (৫৪), মো. আবদুল শেখ (৬৪), মোছা. রোবেদা বেগম (৪৬), মোছা. আসিয়া খাতুন (৫০), মোছা. মানিকজান (৩৮), মোছা. মরিয়ম বেগম (৮ মাস), মোছা. রেহানা খাতুন (৫২), মোছা. অবিরন নেছা (৫০), মোছা. মনি বেগম (৩৬), মো. আবদুল হাই (৫৫), শাহাদাৎ হোসেন (৬৫), মোহাম্মদ সলিমুদ্দিন (৭০), মো. বারেক আলী (৭০), মোছা. পরিষ্কার বেগম (৭০), মোছা. রেশমী বেগম (৭০), ওয়াসউদ্দিন (৪৫), সয়ব আলী (৪৫), আমির মির্জা (৪৫), জামিলা খাতুন (৫০), হাছেন আলী (৬০), খায়ের আলী (৩৫), জামিলা খাতুন (৩৫), শাহজাহান আলী (৪৩), আবদুল বারিক (৭৮), আকবর আলী (৭০), ছকিনা বেগম (৭০), চন্দ্রবানু (৫২), আলেব আলী (৭০), আলাউদ্দীন (৪০), ফুলচান আলী (৫৪), রহম উদ্দিন (৬০), ফজর আলী (৪৩), শরিফ আলী (৮০), জহর আলী (৫০), সদর আলী (৭২), ইদ্্িরস আলী (৭৫), ফুলবানু (৭০), মনোয়ারা বেওয়া (৫০), দয়জন বিবি (৭৫), হালিমা খাতুন (৪৮), ফজের ম-ল (২১), তাছলিমা ম-ল (১৯), ধানুমিয়া (৩৮), সুখীনা খাতুন (৩০), সুমি বেগম (৩১), করিম হোসেন (১২), ইমাদ উদ্দিন (০৬), বসির আহম্মেদ (০৯), আজমিরা খাতুন (২৫) ও নূর ইসলাম (৬৫)।