ছয় বছর পর আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা ইতিমধ্যে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। তবে ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদ এবং ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো সংগঠন এখনো পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করতে পারেনি। মনোনয়ন ফর্ম নেওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা লক্ষ করা গেছে। তারা অন্তত চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। যেখানে অন্য ছাত্রসংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীবান্ধব কার্যক্রমে সক্রিয়, সেখানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ‘নীরব’ দর্শকের ভূমিকায় রয়েছেন। সংগঠনটি এখনো তাদের মনোনীত প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি।
মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের শেষ দিন মঙ্গলবার হলেও নির্বাচন কমিশন পরে তা বুধবার পর্যন্ত বাড়িয়েছে। শেষ দিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সংসদে ৯টি প্যানেল এবং স্বতন্ত্রভাবে মোট ৬৫৮ জন প্রার্থী মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। ডাকসুতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৯ হাজার ৭৭৫ জন। এবারের নির্বাচন নিয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির বেশি আলোচিত। গত ফেব্রুয়ারিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশের উদ্যোগে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ গঠিত হয়। এই সংগঠনের প্যানেলে ভিপি পদে আবদুল কাদের, জিএস পদে আবু বাকের মজুমদার এবং এজিএস পদে আশরেফা খাতুন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। তারা ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ নামে প্যানেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন; যদিও এখনো পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেননি। অভ্যুত্থানের পর থেকে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় ও হলকেন্দ্রিক শিক্ষার্থীবান্ধব কাজে সক্রিয় রয়েছেন। ডাকসু নির্বাচনের দাবি ও দ্রুত বাস্তবায়নে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
অন্যদিকে, ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ নামে ২৮ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। এই প্যানেলে ভিপি পদে সাদিক কায়েম, জিএস পদে এস এম ফরহাদ এবং এজিএস পদে মহিউদ্দিন খান রয়েছেন। প্যানেলে চারজন নারী, জুলাইয়ে চোখ হারানো একজন যোদ্ধা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শিবির ক্যাম্পাসে জুলাই নিয়ে বেশ কয়েকটি বড় আয়োজন করেছে। এছাড়া, ১৮টি হলে ঠান্ডা সুপেয় পানির ফিল্টার স্থাপনের মাধ্যমে শিবিরের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। তবে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন শিবিরের বিরুদ্ধে গুপ্ত রাজনীতির অভিযোগ তুললেও শিবির দাবি করছে, তারা প্রকাশ্যে এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করছে। ঢাবি শিবিরের সাবেক সভাপতি সাদিক কায়েম ভিপি পদে বেশ এগিয়ে রয়েছেন।
গত সোমবার ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষিপ্তভাবে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। স্বতন্ত্রভাবে ভিপি পদে ছাত্রদলের ঢাবি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল ইসলাম জিসান, জিএস পদে সূর্যসেন হলের সদস্য সচিব আবিদুর রহমান মিশু, ঢাবি শাখার তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক জারিফ রহমান, জসীম উদ্দীন হলের আহ্বায়ক তানভীর বারী হামীম এবং এজিএস পদে বিজয় একাত্তর হলের আহ্বায়ক তানভীর আল হাদী মায়েদ ও আল রাজিব রহমান মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। তবে নেতারা জানিয়েছেন, তারেক রহমান ছাত্রদলের প্যানেল ঘোষণা করবেন।
দীর্ঘদিন ধরে প্রার্থী চূড়ান্ত না হওয়ায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ডাকসুকেন্দ্রিক প্রচার-প্রচারণা ও সামাজিক কার্যক্রমে পিছিয়ে রয়েছেন। প্রার্থী হতে পারবেন কি না তা নিশ্চিত না হওয়ায় তারা এখনো কার্যক্রম গুছিয়ে উঠতে পারেননি। গতকাল মঙ্গলবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্যানেল ঘোষণার কথা থাকলেও তা এখনো ঘোষিত হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ছাত্রদল নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারেক রহমান প্যানেল চূড়ান্ত করবেন। কে প্রার্থী হবেন তা নিশ্চিত না হওয়ায় তারা কাজে এগোতে পারছেন না। এছাড়া, প্রার্থিতা নিয়ে সিনিয়র-জুনিয়র মতবিরোধের কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ।
অন্যদিকে, ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা এবং ঢাবি সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতির নেতৃত্বে নতুন প্যানেল ঘোষিত হয়েছে। এতে ভিপি পদে উমামা ফাতেমা, জিএস পদে আল সাদী ভূইয়া এবং এজিএস পদে সাংবাদিক সমিতির বর্তমান সভাপতি মহিউদ্দিন মুজাহিদ মাহী মনোনয়ন নিয়েছেন।
একমাত্র নারী ভিপি প্রার্থী হিসেবে উমামা ফাতেমা ব্যাপক আলোচিত। নারী শিক্ষার্থীদের পক্ষে তার সক্রিয়তার কারণে অনেকে মনে করেন, তিনি নির্বাচনে জয়ী হতে পারেন।
‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ নামে প্যানেল ঘোষণা করেছে বাম সংগঠনগুলোর মোর্চা গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। প্যানেলে ভিপি পদে শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি, জিএস পদে মেঘমল্লার বসু এবং এজিএস পদে মো. জাবির আহমেদ জুবেল মনোনীত হয়েছেন। এই প্যানেলে মেঘমল্লার বসু বেশ আলোচিত নাম। বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা এবং স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রসংসদের জামালউদ্দিন মোহাম্মদ খালিদও আলোচনায় রয়েছেন। তারা ডাকসু আয়োজন ও শিক্ষার্থীবান্ধব কাজে সক্রিয় ছিলেন।
ঢাবি শিবির সভাপতি এস এম ফরহাদ বলেন, ‘আমরা কে কী করছে তা নিয়ে ভাবি না। শিক্ষার্থীবান্ধব নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়তে আমরা ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ব্যানারে কাজ করব। প্রতিদ্বন্দ্বিতা কার সঙ্গে হবে, তা শিক্ষার্থীরা ঠিক করবেন। ডাকসুর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে চাই।’
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে ছাত্রদলের তৎপরতা কম বলে গণমাধ্যমে স্বীকার করেছেন ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন। তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে সমান সুযোগের দাবি জানানো হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রলীগের অনেকে ভোটার তালিকায় রয়েছেন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে থাকা কিছু শিক্ষক এখনো হলের প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষক হিসেবে রয়েছেন। এ কারণে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হল পর্যায়ে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস।
ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক উমামা ফাতেমা বলেন, ‘আমরা যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কাজের ভিত্তিতে প্যানেল সাজিয়েছি। ডাকসুকে জাতীয় নেতা-নেত্রী তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাই না।’
প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘এবারের ডাকসু নির্বাচনের তাৎপর্য আলাদা। প্রথমবারের মতো হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। ফলে কোনো ভোটারের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেই। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে।’