রাজস্ব আহরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মাসভিত্তিক একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার ১১০ দশমিক ৯৬ কোটি টাকা। কিন্তু মাসটিতে আয়কর, মূসক ও শুল্ক মিলিয়ে আদায় করতে পেরেছে ২৭ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা। এ হিসাবে ঘাটতি ২ হাজার ৮৬১ দশমিক ৯৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, গত মে ও জুনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাগাতার আন্দোলনে লাগাম টানতে পারলেও রাজস্ব আহরণে গতি ফেরাতে পারেনি এনবিআর। নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে অর্জিত হয়নি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা।
গতকাল বুধবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের শুল্ক-কর আদায়ের হালনাগাদ চিত্র প্রকাশ করেছে এনবিআর। সেখানে দেখা যাচ্ছে, জুলাইয়ে ২৭ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আনুমানিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। গত অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৯১৬ দশমিক ০৮ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে ১০ হাজার ১৪৯ দশমিক ৭৩ কোটি টাকার শুল্কের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৬০২ দশমিক ০৩ কোটি টাকা। মাসটিতে ১০ হাজার ৭৪৯ দশমিক ৪৮ কোটি টাকার মূসক (ভ্যাট) আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আদায় হয়েছে ১১ হাজার ৩৫২ দশমিক ০৩ টাকা। জুলাইয়ে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি এসেছে মূসক বা ভ্যাট খাত থেকে। এ ছাড়া ৯ হাজার ২১১ দশমিক ৭৫ কোটি টাকার আয়কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ২৯৫ দশমিক ০৩ কোটি টাকা। জুলাই মাসে কোনো টার্নওভার কর আদায় হয়নি। ভ্রমণ কর আদায় হয়েছে ১৬৯ কোটি, গত অর্থবছরের একই সময়ে আদায় ছিল ১৪৭ কোটি টাকা।
তবে গত বছর জুলাই মাসের তুলনায় এবার প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল রাজস্ব বোর্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা আল আমিন শেখ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, জুলাইয়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। কিন্তু কত লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সেটি উল্লেখ করা হয়নি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই মাসে ২৭ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে এনবিআর। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। চলতি বছর জুলাই মাসে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৫ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার ২৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
গত বছর যেদিন অর্থবছর শুরু হয়, সেদিন থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে দেশব্যাপী কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। সেই আন্দোলনের কারণের অর্থবছরের প্রথম দিন থেকেই রাজস্ব আহরণ বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু চলতি বছর সেরকম কোনো পরিস্থিতি ছিল না। ফলে গত বছর জুলাই মাসের সঙ্গে চলতি বছর জুলাই মাসের তুলনা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয় বলে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। কাজেই এনবিআর যে প্রবৃদ্ধি অর্জনের কথা বলছে, সেটি এনবিআরের প্রচেষ্টার ফসল নয়, বরং স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করায় এমনিতেই রাজস্ব আহরণ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
চলতি বছর ১২ মে মধ্যরাতে এনবিআরকে দুই ভাগ করে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও রাজস্বনীতি নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ করে অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। গোল বাধে তারপরই। কিছু কর্মকর্তা সরকারের এ সিদ্ধান্তকে ‘মর্যাদাহানি’ মনে করে আন্দোলনে নামেন। এরপর ২২ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অধ্যাদেশে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। আর সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান কাঠামোতেই চলবে এনবিআরের সব কাজ। ঘটনার একপর্যায়ে ২৮ জুন থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ শুরু হলে দুদিন স্থবির হয়ে পড়ে আমদানি-রপ্তানিসহ এনবিআরের সব কার্যক্রম। পরে সংকট সমাধানে পাঁচ উপদেষ্টাকে নিয়ে উপদেষ্টা কমিটি গঠন করার কথা জানায় সরকার। এরপর ধাপে ধাপে আন্দোলনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে থাকে এনবিআর। অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। ৩৬ জন কর্মকর্তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। ফলে রাজস্ব প্রশাসনে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা সারাক্ষণ আতঙ্কে আছেন যে কখন কার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এসব কারণে এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।