মেট্রোরেলের নকশা ভেঙে বিলবোর্ড

মেট্রোরেলের নিচের স্থান রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পেয়ে নকশা ভেঙে বিলবোর্ড স্থাপন শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এতে একদিকে মেট্রোরেলের সৌন্দর্য নষ্ট হবে, অন্যদিকে শহরের প্রাণ-প্রকৃতির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) তাদের এলাকায় মেট্রোরেলের পিলারগুলোতে গ্রাফিতি এঁকেছে। পরিবেশের কথা বিবেচনা করে তারা এ ধরনের বিলবোর্ড স্থাপনের কোনো পরিকল্পনা করছে না।

ডিএনসিসির গ্রাফিতি মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে, কিন্তু ডিএসসিসির বাণিজ্যিক বিলবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সমালোচনার মুখে ডিএসসিসি বিলবোর্ড স্থাপনের কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।

মেট্রোরেলের মূল নকশায় এ ধরনের বিলবোর্ড না থাকলেও ডিএসসিসি এলাকার পিলারগুলোর পাশে ডিজিটাল বিলবোর্ডের ফ্রেম স্থাপন করা হয়েছে। এসব বিলবোর্ড বসাতে গিয়ে সড়কের মিডিয়ানে থাকা কিছু ফুলের গাছও কাটা পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিলবোর্ডগুলো মেট্রোরেলের সৌন্দর্য নষ্ট করবে। পাশাপাশি সড়কে যানবাহন চালকদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাবে। তীব্র আলোর ঝলকানি চালকের চোখে লেগে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এ ছাড়া পথচারীদের চোখেও নানা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিজিটাল বিলবোর্ডে নানা রঙের নিয়নবাতি ব্যবহার করা হয়, যা বিরক্তি সৃষ্টি করে। এটি চোখে প্রতিফলন তৈরি করে এবং গাড়ির চালকের চোখে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘এসব বিলবোর্ড প্রাণ-প্রকৃতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলেও বিলবোর্ডগুলো জ্বলতে থাকে। কিন্তু এ সময় পাখি ও কীটপতঙ্গের প্রজননের সময়। বিলবোর্ডের আলোর কারণে পাখি ও বিভিন্ন পতঙ্গের প্রজননে ব্যাঘাত ঘটে। ফলে শহরে পাখির সংখ্যা কমে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসব বিলবোর্ডে প্রচুর বিদ্যুৎ অপচয় হয়। এতে অতিরিক্ত তাপ নির্গত হয়, যা হিট আইল্যান্ড তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। এ ব্যবসায় হয়তো গুটিকয়েক মানুষ উপকৃত হতে পারে, কিন্তু প্রাণ-প্রকৃতির বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনে ডিজিটাল বিলবোর্ড। তাই ঢাকার মতো শহরে যত সম্ভব ডিজিটাল বিলবোর্ডের ব্যবহার কমিয়ে আনা উচিত।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাঈদ খোকন মেয়র থাকাকালে নগর জুড়ে ছোট ছোট বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সমালোচনার মুখে সেগুলো তুলে নেওয়া হয়। এখন আবার মেট্রোরেলের মতো স্থাপনা ঘিরে এমন উদ্যোগ নিয়েছে সিটি করপোরেশন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মতিঝিল থেকে কারওয়ান বাজার সার্ক ফোয়ারা পর্যন্ত মেট্রোরেলের নিচের অংশ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পেয়েছে ডিএসসিসি। কারওয়ান বাজার থেকে উত্তরা পর্যন্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ডিএনসিসিকে। সম্প্রতি বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য মতিঝিল থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত মেট্রোরেলের পিলারে বিলবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেয় ডিএসসিসি। এরই মধ্যে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় থেকে বাংলা মোটর পর্যন্ত সড়কে মেট্রোরেলের পিলারের পাশে বোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।

ডিএসসিসি সূত্র জানায়, বিশ্বের অনেক উন্নত শহরে মেট্রোরেলের পিলারে বিলবোর্ড রয়েছে। এতে নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। এরই মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে বিলবোর্ড স্থাপনের কাজ দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত ফি বাবদ এক কোটি টাকার বেশি পাবে সিটি করপোরেশন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ খরচে মেট্রোরেল লাইনের নিচে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করবে। এর আগে ২০২৩ সালের আগস্টে মেট্রোরেলের পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়। তখন মিডিয়াকম নামের একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় মেট্রোরেল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সিটি করপোরেশনকে অবগত না করে এ উদ্যোগ নেওয়ায় সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। তখন বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ ও দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মেট্রোরেল কর্র্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। সেই চিঠিতে আইনের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে বিলবোর্ড ও বিজ্ঞাপনী বোর্ড স্থাপন না করতে অনুরোধ করা হয়। এর কিছুদিন পর মেট্রোরেল কর্র্তৃপক্ষ সিটি করপোরেশনকে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিলবোর্ড স্থাপনের জন্য অনুরোধ জানায়। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯-এর আদর্শ কর তফসিল ২৯৮ ও ২৯৯ ধারা অনুযায়ী সিটি করপোরেশন এলাকায় সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ফলকের জন্য নির্ধারিত হারে ফি দিতে হয়। সিটি করপোরেশনের অনুমতিও প্রয়োজন। এসব বিষয় সামনে এলে মেট্রোরেল কর্র্তৃপক্ষ এ উদ্যোগ থেকে সরে আসে।

মেট্রোরেল নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ বলেন, ‘মেট্রো স্টেশন এবং ওপরের লাইন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের। নিচের স্থানের মালিক আমরা নই। নিচে কী করা হবে বা হবে না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই।’

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএমটিসিএলের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পিলার কেন্দ্র করে বিলবোর্ড স্থাপন মেট্রোরেলের নকশায় নেই। কিন্তু আইনে বাধ্যবাধকতা না থাকায় ডিএসসিসি পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবারও বিলবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।’

ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রাসেল রহমান বলেন, মেট্রোরেলের পিলারের পাশে বিলবোর্ড স্থাপনের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আপাতত এই কাজ বন্ধ রয়েছে। পরবর্তীকালে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

উত্তরে গ্রাফিতি : এদিকে কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারা থেকে উত্তরা পর্যন্ত মেট্রোরেলের পিলারে গ্রাফিতি আঁকছে ডিএনসিসি। এরই মধ্যে সার্ক ফোয়ারা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত পিলারগুলোতে নানা ধরনের গ্রাফিতি শোভা পাচ্ছে। এতে ফুটে উঠেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের গত দেড় দশকের নানা ঘটনার প্রতিচ্ছবি। যার শিরোনাম ‘ফিরে দেখা ফ্যাসিস্ট রেজিম’। এতে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সমালোচিত ইস্যুগুলো শিল্পকর্মের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। নানা রঙের সংমিশ্রণে দৃষ্টিনন্দন এ চিত্রশৈলীতে উঠে এসেছে পিলখানা ট্র্যাজেডি, খালেদা জিয়ার কারাবরণ, সীমান্তের কাঁটাতারে ফেলানীর মরদেহ, শাপলা চত্বরে গণহত্যা, রাতের ভোট, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, রানা প্লাজা ধস, বিরোধী নেতাদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার, কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে হামলা, পুলিশি দমনপীড়ন, তনু ধর্ষণ, প্রশ্নপত্র ফাঁস, পুরান ঢাকায় বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে হত্যা, ক্যাঙারু কোর্ট, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ড, করোনার ভুয়া টেস্ট এবং ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের চিত্র।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেট্রোরেলের পিলারে আমরা গ্রাফিতি আঁকছি। এতে বিলবোর্ড স্থাপনের কোনো পরিকল্পনা নেই।’ তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে গ্রাফিতির উদ্যোগ নিলেও সম্পূর্ণ কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এ গ্রাফিতি অন্যদের জন্য বিশেষ বার্তা হিসেবে কাজ করবে।’