অনিয়মের দুর্গন্ধ চামড়া শিল্পনগরীর সারা গায়ে

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:১০ এএম

ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চামড়া শিল্পনগরী দেশের চামড়া খাতের প্রধান কেন্দ্র। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের পর কথা ছিল চামড়াশিল্প খাত পৌঁছাবে আন্তর্জাতিক মানে। একই সঙ্গে রোধ করা যাবে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ। তবে প্রায় দেড় যুগ পর এসে দেখা যাচ্ছে, এসব লক্ষ্যের খুব সামান্যই পূরণ হয়েছে। উল্টো প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি এবং অনিয়মের প্রমাণ উঠে এসেছে সরকার নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষাতেই। দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্য পূরণের পরিবর্তে এই চামড়া শিল্পনগরী নিজেই দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ওই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বাস্তবায়ন কাজ ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রাথমিকভাবে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১৭৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। তবে ১৮ বছর ৬ মাস শেষে ২০২১ সালের জুনে কাজ শেষ হয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) সাভারে শিল্পনগরীর কাজ বাস্তবায়ন করে। শেষ পর্যন্ত ব্যয় পৌঁছায় প্রায় হাজার কোটি টাকায়।

প্রকল্পে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হয়েছে ৯৩৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। শুরু থেকে মোট ১৭ কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। আর এ সময়ে মোট ৪৭টি খাতে মোট ৯৯৫ কোটি ৭১ লাখ ৩২ হাজার ৩৫ টাকার অডিট আপত্তি এসেছে। বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ক্ষতিকর বর্জ্য পরিশোধন করতে ৪৭৭ কোটি ৫২ লাখ ১৭ হাজার টাকায় নির্মাণ করা সিইটিপি (সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার) লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে খোদ সরকারি সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সমীক্ষায় প্রকল্পটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্যও এসেছে। আইএমইডি নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘প্রকাশ গণকেন্দ্র (পিজিকে) ’ এই সমীক্ষা পরিচালনা করে।

পিজিকের প্রতিবেদনে অবৈধ আড়ত, মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা, কাঁচাচামড়া বাজারে অস্বচ্ছতা, প্রশাসনিক ভবনের ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু না হওয়া, রেন্টাল নীতিমালার অভাব, অডিট আপত্তি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কিছু অবকাঠামোর অপূর্ণাঙ্গ ব্যবহারকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ডাম্পিং ইয়ার্ড ও ক্রোম ব্লকের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। এটি ভবিষ্যতে বড় পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনে।

দেখা গেছে, একাধিক সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় ১ হাজার ১৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত কাগজপত্রে প্রকৃত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯৩৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকায়। সরকারি নিরীক্ষায় অবশ্য এর চেয়েও কয়েকশ কোটি টাকা বেশি ব্যয়ের অনিয়ম পাওয়া গেছে। এসব ব্যয় এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

পিজিকে বলছে, প্রকল্পের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৪৭টি আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি। এসব বিষয়ে সরকারি নিরীক্ষা কর্র্তৃপক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে। এতে বোঝা যায়, বিসিক চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক শৃঙ্খলার ঘাটতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতা রয়েছে। বেশিরভাগ আপত্তি এখনো ‘ব্রডশিট জবাব প্রেরণ’ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকায় কার্যকর নিষ্পত্তির অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। আপত্তিগুলোতে মোট অর্থের পরিমাণ ৯৯৫ কোটি ৭ লাখ ৩২ হাজার ৩৫ টাকা।

পিজিকের মূল্যায়নে বলা হয়, প্রকল্পটি শুধু বাস্তবায়নকালে নয়, বাস্তবায়নপরবর্তী পর্যায়েও আর্থিক, প্রশাসনিক ও কারিগরি ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিক দুর্বলতায় ভুগছে। একই ধরনের অনিয়ম বারবার হওয়া এবং বেশিরভাগ আপত্তি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার বিষয়টি প্রকল্পে অব্যবস্থাপনার দিক নির্দেশ করছে।

আইএমইডির প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, সিইটিপি ক্ষতিকর বর্জ্য পরিশোধনে সক্ষম না হওয়ায় প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জিত হয়নি। এর জন্য ব্যয় হয়েছে ৪৭৭ কোটি ৫২ লাখ ১৭ হাজার টাকা। প্রকল্প সমীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান মনে করছে, বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও এটি প্রত্যাশিত সক্ষমতা অর্জন করেনি। ফলে পরিবেশ সুরক্ষা লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার পাশাপাশি ব্যয় হওয়া অর্থের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সমীক্ষার পর্যবেক্ষণ বলা হয়, হাজারীবাগে সরাসরি বর্জ্য নদীতে ফেলায় মারাত্মক দূষণ হতো। এরপর সাভার শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরের পর সিইটিপি, ক্রোম রিকভারি ও স্ল্যাজ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা স্থাপন করা হলেও তা পর্যাপ্ত কার্যকর হয়নি। উৎপন্ন বর্জ্য-পানির পরিমাণ সিইটিপির ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি হওয়ায় শোধন কার্যক্রম ব্যাহত এবং পরিবেশগত মান পূর্ণভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

একইভাবে কঠিন বর্জ্য ও স্ল্যাজ ব্যবস্থাপনাতেও বড় ঘাটতি রয়েছে। আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ বা পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ায় অনেক বর্জ্য খোলা স্থানে জমা হচ্ছে। এ কারণে পরিবেশগত ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। মূল পরিকল্পনায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ  নেওয়ার থাকলেও বাস্তবে কার্যকর হয়নি।

প্রকল্প কাজ চলার সময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমতি ছাড়াই কোম্পানি গঠনের মাধ্যমে প্রকল্প থেকে সংশ্লিষ্টরা ৩০ কোটি ১১ লাখ টাকা তুলে নেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বরাদ্দ করা প্লটের ভূমি উন্নয়ন কর, প্লটের সার্ভিস চার্জ, জমির প্রিমিয়াম আদায় না করায় সরকারের শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রসেস ওয়াটার সাপ্লাই অ্যারেজমেন্ট কাজের জন্য ছাড় করা ও ব্যয় না হওয়া ১৭ কোটি ৮০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত না দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের উল্লেখও রয়েছে। এ ছাড়া আরডিপিপি অনুয়ায়ী, ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণ না করলেও ব্যয় হিসাবে পরিশোধ করা হয়েছে ৮ কোটি ২২ লাখ ৬৪ হাজার ৯০০ টাকা।

পিজিকে বলছে, বিভিন্ন অনিয়মের কারণে প্রকল্পে রাজস্ব আহরণসংক্রান্ত গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে প্লটের প্রিমিয়াম, সার্ভিস চার্জ, পানি বিল, ভ্যাট এবং অন্যান্য ফি যথাসময়ে আদায় না করায় বিপুল অর্থ অনাদায়ী থেকে গেছে। প্রকল্পে সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও অসঙ্গতি পেয়েছে সমীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে নীতিমালা উপেক্ষা করে নতুন কোম্পানি গঠন এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামো ছাড়াই অর্থ লেনদেন পরিচালনার মতো গুরুতর অনিয়ম এবং সরকারি স্বার্থের পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেছে তারা।

আইএমইডি প্রতিবেদনে চামড়া শিল্পনগরীর পরিবেশগত প্রভাব : সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রসঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়নের বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। অডিট আপত্তির ব্যাপারে আমরা করপোরেশনের পক্ষ থেকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব। আপত্তি থাকলে তার ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে দিয়ে সমাধানের পথে যেতে হবে। সিইটিপির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বসহ এসেছে। এ ব্যাপারে খাতসংশ্লিষ্টদের অনেক দিনের অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে পরিবেশগত দিক বিবেচনায় সমালোচকরাও এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়গুলোতে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছি। সরকারও শিল্পনগরী নিয়ে আন্তরিক। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় ইতালির একটি কোম্পানি বর্তমান সিইটিপি নিয়ে কাজ করছে। সেই সঙ্গে নতুন আরও একটি সিইটিপি নির্মাণের প্রস্তাব এসেছে। আমরা প্রয়োজনীয় জমির ব্যবস্থা করতে পারলে কোম্পনিটি আমাদের সহায়তা করবে। চলতি মাসে এর ওপর তারা একটি প্রতিবেদন দেবে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে শিল্পনগরীর সিইটিপি ১৫ হাজার কিউবিক মিটার পানি শোধন করতে পারে। এটি আমরা ২৫ হাজার কিউবিক মিটারে উন্নতি করতে চাচ্ছি। নতুন কোনো সিইটিপি স্থাপনের মাধ্যমে অথবা যেসব বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জমিতে সিইটিপি স্থাপনের সক্ষমতা রয়েছে তাদের মাধ্যমে এটি হতে পারে। বিষয়টি ইতিমধ্যে তাদের অবহিত করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত করছি। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতেরও নির্দেশনা রয়েছে। এখানকার ৩৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিইটিপি স্থাপনের সক্ষমতা রয়েছে। নিজস্ব উদ্যোগে সিইটিপি স্থাপন করা গেলে নতুন প্রকল্প বা স্থাপনার প্রয়োজন হবে না। সারা বছর এর রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি অর্থের অপচয়ও হবে না।’

সমীক্ষা প্রতিবেদনে চামড়া শিল্পনগরীর কিছু সুবিধা ও সম্ভাবনার কথা অবশ্য বলা হয়েছে। মূল্যায়নে বলা হয়, হাজারীবাগের তুলনায় সাভারের উৎপাদন ব্যবস্থা বেশি পরিকল্পিত। সেখানকার অবকাঠামো উন্নত এবং উৎপাদন সক্ষমতার সম্প্রসারণ ঘটেছে। অনেক ট্যানারিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করায় উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বেড়েছে। ব্যবসাবাণিজ্যের সম্প্রসারণের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত